শুধু শরীর নয়, মনের যত্ন নেওয়াটা জরুরী

- Risan Reza

বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা (WHO) মানসিক সাস্থ্যকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে ৪ টি বিষয়ে আলোকপাত করে। তাদের তথ্যমতে, মানসিক স্বাস্থ্য বলতে এমন এক অবস্থাকে বুঝায় যখন-
১. প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করে,
২. তার নিজের স্বাভাবিক চাপ মোকাবেলা করতে পারে, 
৩. তার কাজগুলো উৎপাদনশীল ও ফলপ্রসূভাবে সম্পাদন করতে পারে এবং 
৪. ব্যক্তি তার নিজের বা সম্প্রদায়ের কল্যানে অবদান রাখতে পারে

WHO তাদের সংবিধানে সাস্থ্যের সংজ্ঞায় মানসিক সাস্থ্যের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, ” Health is a state of complete physical, mental and social well-being and not merely the absence of disease or infirmity.”

উপরের আলোচনায় কিছু বিষয় স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের সমাজের অনেকেই আছি যারা নিজের সম্ভাবনা বা Potential কে বুঝতে পারি না। ছোট- বড় বিভিন্ন চাপে ভেঙ্গে পড়ি। সবসময় নিজের কাজগুলো Productive করে তুলতে পারি না৷ কিন্তু এগুলো নিয়ে ভাবার সময় আমাদের থাকে না। এসকল ক্ষেত্রে আমাদের দুশ্চিন্তা, তীব্র মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, হীনমন্যতাসহ নানারকম জটিলতা তৈরি হয়। একসময় আমরা হতাশ হয়ে পড়ি, বিষণ্ণতা আমাদের গ্রাস করে। ফলাফল তীব্র মানসিক সমস্যা যা শরীরের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

দ্যা ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ (ডাব্লিউএফএমএইচ) এর তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন করে কিশোরী মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছে৷ এছাড়া মানসিক বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনায় তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। ডাব্লিউএফএমএইচ গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে বুলিং (মানসিক বা শারীরিকভাবে হেনস্তা) এর শিকার হবার ফলে ৮৩ শতাংশ তরুণের জীবনে নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে।

পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থায় নগরায়ন, আধুনিকায়নের ছোঁয়ার পাশাপাশি ডিজিটালাইজেশনের যে প্রভাব তার ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নেতিবাচক কিছু দিক তৈরি হচ্ছে৷ পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের চিন্তা চেতনার। সমস্যার ডাইমেনশনও ঠিক একই ভাবে পরিবর্তন হয়ে চলেছে। ডাব্লিউএফএমএইচ জানাচ্ছে বর্তমান তরুণদের মানসিক জগৎকে খুব বেশি প্রভাবিত করছে সাইবার বুলিং। প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে এ ঘটনাটি এড়ানো যাচ্ছেনা। ইদানিং পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফল না করতে পারা, প্রত্যাশিত চাকুরী না পাওয়া, সঙ্গীর সাথে বিচ্ছেদ ইত্যাদি তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

যে দেশে তারুণ্য যত বেশি, সে দেশের সম্ভাবনা ঠিক ততটাই বেশি। বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বয়স ১৫-২৪ এর ঘরে। প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ যারা ২৫-৩৫ এর ঘরে রয়েছে। দেশের অগ্রগতির দায়দায়িত্ব এখন এই সম্প্রদায়ের উপর বর্তাবে। তাই এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবা যেতেই পারে যারা একসময় দেশটার নেতৃত্ব দিবে।

বাংলাদেশে একটা বিষয় বহুল প্রচলিত যে, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সকল সমস্যা শারীরিক কারণ তা দেখা যায়। মানসিক সমস্যা বা বৈকল্য তেমন কোন বালাই নয়, কারণ তা তো আর দেখা যায় না। সমস্যা দানা বাঁধা শুরু হলে এটাকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ভেবে মানুষ এটাকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় মানুষ যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তখন তিনি তার চেয়ে যে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা উন্নততর তার নিকট বুদ্ধি পরামর্শ আশা করেন। মৃদু মানসিক সমস্যাকে আমলে না নিয়ে কারো কাছে জানাতে দ্বিধাগ্রস্থ থাকে এই ভয়ে যে, মানুষ তাকে মানসিক রুগী ভাববে। ফলে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে যা কখনই কাম্য নয়। ঘুমের সমস্যা বা নিদ্রাহীনতা, খিটখিটে মেজাজ, মৃদু মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, হতাশা এসব থেকে এক সময় জন্ম নেয় স্কিজোফ্রেনিয়্যা, বাই পোলার মুড ডিজঅর্ডার, শূচিবায় (ওসিডি) পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার কনভারসন ডিজঅর্ডারসহ জটিল কিছু মানসিক সমস্যা।

বিশ্বব্যাপী মানসিক সাস্থ্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশেও ঠিক একইভাবে এই ইস্যুটিকে গুরুত্ব সহাকারে দেখা প্রয়োজন। কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সাস্থ্যের সুস্থতার জন্য যেমন তাদের অভিভাবকদের ভাবতে হবে। ঠিক তেমনি ভাবে ভাল মন্দ নির্ধারণে তাদের সাহায্য করতে হবে। আর তরুণদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়াটা জরুরী। কারণ একসময় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন এই তরুণরাই। প্রবীণ এবং নারীদের মানসিক সাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া জরুরী। কারণ তারা বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় অনেক বেশি নির্ভরশীল থাকেন। তাই তাদের মানসিক সমস্যাগুলো শোনা বা বোঝাটা খুব জরুরী।

জাতিসংঘের মহাসচিব এ্যান্থনিও গুতিরেজের সুরে বলতে চাই, 
“If we change our attitude to mental health- we change the world. It is time to act on mental health.”

 

Risan Reza
১০ অক্টোবর, ২০১৮

(মোট পড়েছেন 122 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন