পিতা মৃত: মাষ্টার আবু তাহের ভুইয়া স্মরণে

- মাস্টারমাইন্ড প্রিন্স মাহী

লক্ষীপুরের পূর্ব কোনে ছোট্ট ক’টি নিবিড় গ্রাম
সব চেয়ে বেশি মনোরম চর-শাহী তার নাম
সবুজ শেমল ছায়ায় ঘেরা তারই অহংকার
সেথায় বাস করে এক আবু তাহের ভুইয়া পরিবার

পেশায় তিনি ডাক্তার আবার স্কুলের হেড টিচার
যারে কয় কারিগর মানুষের মত মানুষ গড়িবার
মাস্টার মশাই’র পিতামহ ফজলুল হক চুয়ানি
বেদনার নীল কালিতে লেখা এই করুন কাহানি

চুয়ানি ভূঁইয়ার ছিলেন দুই ছেলে এক মেয়ে
তাহের, কালাম এবং বেগম ছোট সবার চেয়ে
মাস্টার তাহের ডাক্তারিতে ছিলনা অজ্ঞতা
চিকিত্সা বিজ্ঞানে তার, ছিল প্রচুর দক্ষতা

মুক্তি যোদ্ধা আবুল কালাম বীর এবং গাজী
দেশের জন্য লড়াই করে রাইখা জীবন বাজি
দুই দুহিতা ছয় ছেলের পিতা ডাক্তার আবু তাহের
সবার প্রিয় মানুষ ছিলেন চরশাহী গাঁয়ের

নম্র ভদ্র মান সম্মান তার ছিল উচ্চা-সন
দান খয়রাতে ছিল তেমন একটি বিশাল মন
আমি তাহার অনাদরের সেই ছোট্ট শিশু মাহি
যারে ফেলে সেই যে গেল আর না ফিরিলো চাহি

বয়স আমার হবে বোধহয় বছর দুই আড়াই
তখন লাংগা বদনে গাঁয়ের মেঠো পথ মাড়াই
উন্নিশ্য পচাশির এক সোম দিবা চার ঘটিকার পরে
যেন হাক ছেড়ে কে দাড়ায় ঘরের রুদ্ধ দুয়ারে

এমন সময় প্রকম্পিত প্রলয়ের এ বিশ্বময়
ভয় না করার তরে বাবা সুধালেন অবয়
দার ছাড়িয়া দাওগো তোমরা বাইরে দন্ডায়মান
দাও আসিতে হে বিধাতার, প্রিয় প্রেরিত মেহমান

মা মনি মোর বসা ছিলেন বাবার শিয়র পাশে
আমি মায়ের কোলে যেমন শিশির মিশেল ঘাসে
বাবার কথায় মায়ের গলা ভারী হয়ে ওঠে
নয়ন যুগল কোনে শিশির বিন্দু হয়ে ফোটে

হঠাত আসলো ধেয়ে সুনির্মল এক দখিনা বায়ু
সেই বায়ুতে মিশে গেছে তার ক্ষনিকের আয়ু
জাগবেনা এই ঘুম কাতুরে কখনো-বা রাত পোহালে
চির তরে আজ ঘুমে ঘুমিয়ে গেছে নিদ্রা দেবীর কোলে

এই দিবসের অন্তিম লগ্নে রাত বারোটার পরে
ভেঙ্গে গেছে মন আমার এক কাল বৈশাখী ঝড়ে
যবে বাবারে লই ছুটছে সবে বাড়ির উত্তর বাঁকে
আমিও ছিলাম সেই দলেরি লম্বা ঠেংগের ফাঁকে

বুজছি বা-জান পড়ছে আজি দুশমনেরী ফাঁদে
চোখ বুজিতেই গাড়িয়ে দিল বুক পরিমান খাদে
বা-জান আমার বয়োবৃদ্ধ দাত ছিল নড়বড়ে
চলতে গেলে দিক হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে

এই ঘরে আজ আমিও নেই যে রাখবে চোখ খুলে
চলতে গিয়ে হোচট খেলে ধরবে তোমায় তুলে
দেখছি কবর দেয়াল ধরে আর ভাবছি আনমনে
আধার ঘোরে কেমনে বা-জান রইবে বাত্তি বিহনে

শুনেছি শেষ বিদায় লগ্নে ভাই মুরাদ কে বলতে
কাল বিলম্ব না করে এক গুচ্ছ পাটখড়ি আনতে
বাড়ির দখিন পাশের নালায় পাটের খেত বলে
এক নিমিষে আনলে ভাইয়ে এক মুঠো পাট তোলে

খড়ি হস্তে ভাই কে দেখে ফের সুধালেন তার তরে
পারবে কি এক সঙ্গে ভাঙ্গতে সব গুলো এক করে ?
বের্থ চেষ্টায় ভাইজান আমার অসহায়ের মত
মানে খুঁজতে এই পরীক্ষার শির হইছে তার নত

এবার চেষ্টা কর একটি করে রাইখা দু-কর খাপে
ভাঙ্গবে বৈকি অনায়াসে তব হাতের কোমল চাপে?
বিনয় করে বলছি আমার ছয় তনয়ের তরে
বাঁচতে চাইলে বীরের মত মাথা উঁচু করে

এক বাঁধনে থাকবে দেখো আসবে অপশক্তি যত
না পারে কেউ নাড়তে টনক একমুঠো পাঠ খড়ির মত
সারা জীবন থাকলে পরে এক কথায় এক বলে
তবে আসুক যতই অপশক্তি চূর্ণ হবে পদতলে

গঞ্জ হতে বা-জান যে দিন আসতেন বাড়ি ফিরে
কি আনছ মোর লাইগা বলেই খাড়াই পন্থ ঘিরে
আজ কেনো গো কয়না কথা কোলে তুলে নিয়ে
কেন যে বা-জান শুয়ে আছে চাদর মুড়ি দিয়ে

আমি মাহি অবুজ শিশু বলি মায়ের গলা ধরি
বুঝি বাবারে মোর নিতে আইছে ওই পাড়ের তরী ?
সত্যি করে বলবে মাগো কিসের আবেশ ছলে
ভাসছে কেন বুক’ টি তোমার নেত্র কোনের জলে ?

কান্দে পাড়া প্রতিবেশী ভাই বোন ও আত্তীয় সজন
সবে কেন কান্দে এমন আমি কি তার বুজি ওজন
অপলক দু-নয়ন দিয়ে দেখি মা জননীর তরে
এক আঁখিনীর না মুচিতেই অন্য লোচন ভরে

সেদিন কেঁদেছিল পশু পাখি গাছ পালা ও তরু লতা
আমি কেবল বুজলাম না এর পিছনের দুঃখ কথা
সূর্যটা বেশ ম্লান বদনে গোমরা মুখো হয়ে ছিল
কালী মাখা পুঞ্জ মেঘের আড়ালে মুখ সরিয়ে নিল

সেদিন আমিও খুব কেঁদে ছিলাম না জানি কি বুজে
সেই রহস্য কান্নার উত্তর পাইনি আজো খুঁজে
আকাশও খুব কেঁদেছিল ভাসায়ে পাতালের তল
আকাশ কাঁদে বৃষ্টি হয়ে মানুষের হয় নয়ন জল

অষ্ট-আশির বন্যায় যখন যাইছে সবি ভেসে
জিজ্ঞাসিনু বাবা কোথায় মায়ের কাছে এসে
মা দুঃখিনী করুন কষ্ঠে কহেন একটু খানি হেঁসে
তোমার বা-জান গেছে ওই, না ফিরিবার দেশে

তখন, মায়ের কথার ছিল খুবি অর্থ বুজা ভারী
কচি মনের এই যাতনা সইতে কি আর পারি
ছেলেরা সব বাবার পিষ্ঠ ঘোড়ার গাড়ি বানিয়ে
দেখি চড়ে বেড়ায় দিন রজনী আনন্দে মাড়িয়ে I

মাঝে মাঝে মা’কে দেখি সকাল বিকেল সন্ধে বেলা
গুংরে উঠে কান্দে শুধু যখনি মা রয় একেলা
তখন অজানা এক কষ্টে আমার লাগে কেমন জানি
না বুজেই মোর গড়িয়ে পড়ে নয়ন কোনের পানি

যখন দেখি পাড়ার ছেলে নিজ জনকের কোলে
ঘুরে বেড়ায় নিত্য দিবস দোলনায় যেমন দোলে
সাধ জাগে মোর এসব যখন দেখতে আমি পেতাম
বাবা থাকলে হয়ত আমি এমনি দোল খেতাম I

আবার কাঁধে বসে হেলে দুলে চলা প্রাচীন পালকি
দেখিয়া মোর দীর্ঘ শাসের কম্পন বাড়ে আর কি
এসব কি আর সহে আমার, তাই ফিরে চলি বাড়ী
আমার তো আর বাবাও নেই যে হইবে মোর গাড়ি….

কবরের ঠিক পূর্ব দিকের দেয়াল ঘেষে দাড়িয়ে,
স্নেহের আশে বাবার তরে হাত দুটি দেই বাড়িয়ে
বাবা, আমার বুজি সাধ জাগেনা চড়তে তোমার কোলে
পাশের ঘরের বিউটি যেমন বাপের কাঁধে দোলে

তোমার মাহি তোমার তরে বুক চাপড়িয়ে মরে
আর তুমি আজ ঘুমিয়ে টানা তিনটি বছর ধরে
সেদিন কি মোর কচি দুই হাত খাটো ছিল বলে
পাইনি পরশ কিসের তোমার অভিমানের ছলে? I

চৈতের এক দুপুরে ডাকি বাবার কবর বাড়ি যেয়ে
চলো, ভাত বেড়ে মা বসে আছে তোমার পন্থ চেয়ে
সেদিন-ও তো দাও-নি সাড়া তোমার এত অভিমান
নাকি কর্নে তোমার পৌছেনি মোর বাল্য সুরের তান?

এক সকালে আমার নাকি খবর নাহি মিলে
খোঁজে সবে হাট বাজার ও বাড়ির পুবের ঝিলে
সকাল গেল দুপুর পেরিয়ে সন্ধা ঘনিয়ে এলো
অবশেষে আমায় নাকি সেথায় কুড়িয়ে পেলো

যেখানে মোর বাবা রইছে যুগ যুগান্তর ধরে
আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়ে ছিলাম কবর উজাড় করে
আমার সারা অঙ্গ ঢেকে ছিল মাটির আবরণে
অশ্রু মাটির মিশেল কাদায় নিথর দুই নয়নে …

জীবনের গল্প লেখিতে বসিয়া দুঃখ লিখেছি বেশ
যখনি লিখিবো সুখের দেখি কলমের কালী শেষ

(মোট পড়েছেন 150 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন