মাহবুবুল আলমের গল্প

- মাহবুবুল আলম

শ্যাওলা

বারেকা খাতুন বেশ ক’দিন ধরেই একেবারে শয্যা নিয়েছেন। স্বামীর ভিটা ছেড়ে এখন ঠাঁই নিয়েছেন সেঝ মেয়ে কানিজের বাসায়। উপজেলা সদরের গৌরীপুর গঞ্জের কানিজের বাসা। তার স্বামী আতিকুর রহমান সেই গঞ্জেরই এক ঔষধ ব্যবসায়ী। শুধু ঔষধ ব্যবসায়ীই নন, এ গঞ্জেরই এক হাতযশ চিকিৎসকও। এই কারণে বারেকা খাতুন ছেলে-মেয়েদের ঢাকার বাসায় থাকতে যতটা না স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন; কানিজের বাসায় থাকতেই তার চেয়ে বেশি আয়েশবোধ করেন।

ছেলেরা নিজেদের চাকুরী-বাকরী নিয়ে, আর তাদের বউয়েরা তাদের সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক যে, তারা মা বা শ্বাশুড়ির তপ্ততালাপি নিয়ে কোনো মাথাই ঘামান না। তিনি যেন এখন তাদের কাছে অনেকটাই বোঝার মতো। খাওয়া থাকার ব্যবস্থা ছাড়া অনেকটাই পড়শির মতো আচরণ তাদের। মাঝে মধ্যে হাই হ্যালো করেই যেনো দায়িত্ব শেষ। জীবনের এ পড়ন্ত বেলায় একজন নিঃসঙ্গ মানুষের কতটা যে সঙ্গের প্রয়োজন, পরিবারের সদস্যদের সাহচর্য প্রয়োজন তা যেনো কারো হিসাবের মধ্যেই নেই। তারপরও যদি কোথাও থিতু হওয়া যায়। এক মাস মেঝছেলের বাসায় তো আরেকমাস সেঝছেলের বাসায়, বা কখনো ছোট ছেলের বাসা তো আর ক’দিন না যেতেই মেঝ বা ছোট মেয়ে বা অন্য কোনো মেয়ের বাসায়। বারেকা খাতুনের এ যেনো এক শ্যাওলার জীবন।

আর বড় ছেলে! যে নাকি পৈতৃক জমি-জিরাতের প্রায় সবটা একাই ভোগ করে যাচ্ছে; বড় সংসার, নানাবিদ অভাব অভিযোগের কথা বলেই মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন থেকে সযতনে নিজের হাত গুটিয়ে আছেন দিব্যি। স্বামীর ভিটে মাটি, সে বাড়িতে প্রথম বউ হয়ে আসার স্মৃতিচিহ্নের টানে মাঝে মাঝে গিয়ে বাড়িতে থাকতে চাইলেও তা আর হয়ে ওঠেনা, ছেলে বউ ও নাতি-নাতনীদের নির্লিপ্ত আচরণে। ছেলে বউতো পারলে কথায় কথায় কথা শেখানো ময়নার মতো বারেকা খাতুনকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে-‘আম্মা আপনের বড় ছেলে অনেক ঋণ করে ফেলছে। চিন্তায় চিন্তায় তার ঘুম আসেনা। ডাক্তার বলছে- সব সময় এমুন চিন্তা-ভাবনা করলে হার্টের বড় অসুখ আরো বাইরা যাইতে পারে। হের যুদি একটা কিছু হইয়া যায়, তইলে এতোগুলান পোলা মাইয়া নিয়া আমারে পথে বইতে হইবো। পিঠাপিঠি আপনের দুই নাতনী হেলেনা ও জেরিন বিয়ার বয়স পাড় হইয়া গেলেও টাকা পয়সার অভাবে বিয়া শাদী দিতে পাতাছে না।’

অনেক সময় এসব কথার জবাব দিতে চেয়েও দিতে পারে না বারেকা খাতুন। চিরতা গিলার মতো মুখবুজে সব হজম করতে হয় তাকে। কয়েকবার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলেন, স্বামীর বাড়িতে গিয়ে নিজেদের একটা ঘরে আলাদা রান্না-বান্না করে খেতে। কিন্তু স্বামী ও সন্তানদের সন্মানের কথা চিন্তা করে তাও করতে পারেননি। তাই কথা যেহেতু বলতে পারছেন না, বোবা হয়ে থাকাটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেছেন। সেই মতো বোবা হয়ে আছেন তিনি।

বেশ কয়েকমাস যাবত সেঝ মেয়ে কানিজের বাসায় আছেন । কিন্তু মেয়ের বাসায় থাকতেও বারেকা খাতুনের আত্মসন্মানে বেশ বাঁধে। কিন্তু এখানে না থেকেও যে কোনো উপায় নেই। তা ছাড়া এখানে থাকলে মেয়েজামাই সকাল বিকাল শ্বাশুড়ির শরীরের খোঁজ-খবরও নিচ্ছেন। এ বৃদ্ধ বয়সে বারেকা খাতুনের জন্য এটা আরো বাড়তি পাওনা। তাই কিছুদিন আগে কানিজকে বলেছিলেন বারেকা খাতুন-

মারে! এই বয়সে আর গাড়ি ঘোড়া চইড়া এখানে সেখানো ঘুইরা বেড়াইতে সাহস ও শাক্তি কোনটাই পাই না। আর যেই কয়টা দিন বাইচ্চা আছি তর এখানে থাইকাই মরতে চাই। তরা আমারে নিয়া আর টানা হেচরা করিছ না। আমার নামের যে দুইকানি জমি আছে এই জমি আমি তর নামে লেইখ্যা দিতে চাই। জামাইরে না জানাইয়া চল একদিন রেজিষ্টারী অফিসে গিয়া তর নামে রেজিষ্টারী কইরা দিয়া আসি।

মায়ের এ কথা শুনে সেদিন কানিজ খুব আপত্তি জানিয়ে বলেছিল-
আম্মা এই সব আপনি কি বলেন! আপনেরে আর আমি এই বয়সে কোথাও যাইতে দেমু না। আমার নামে জমি লেইখ্যা দেওয়ার দরকার পড়বো না। আপনে ছোট বেলায় আমাগোরে কষ্ট কইরা লালন-পালন করে নাই? লেখা পড়া করান নাই?
হ করছি। বারেকা খাতুন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন।

তাহইলে আর কি। আপনের সেবা করাও আমাদের দায়িত্ব। আপনের জামাই ও নাতি-নাতনীরাও চায় আপনে আমাদের বাসায় সব সময় থাকেন। এই জমি লেইখ্যা দেওয়ার কথা শুনলে হে রাগ করবো। আর আমার ভাই বোনরা সবাই বলব, আপনেরা আমাদের বাসায় রাখার উছিলায়, আমার নামে আপনের জমি লেইখ্যা লইছি। আমার নামে জমি লেইখ্যা দেয়ার কোন দরকার নাই। আপনে শুধু আমার জন্য দোয়া করবেন। আপনের দোয়াই আমাদের অনেক পাওনা।

কয়েকমাস ধরেই কানিজের বাসাই আছেন বারেকা খাতুন। মেয়ে জামাই আতিকুর রহমান ও ছেলের অধিক ছেলের দায়িত্ব পালন করেন শ্বাশুড়ির প্রতি। প্রতিদিনই ব্লাড-প্রেসার চেক করে দেখেন। একটু এদিক ওদিক হলেই প্রেসারের ট্যাবলেট ও গ্লাস ভর্তি পানি নিয়ে হাজির। শ্বাশুড়ির রুচি ও পছন্দ অপন্দের দিকে খেয়াল রেখে প্রতিদিনের বাজার সদাই করেন আতিকুর রহমান। আর নাতি- নাতনীরাতো সারাক্ষণই কখন নানীর কোনটা লাগবে এসব খবরা খবর রাখতেই ব্যস্ত। সব ইতিবাচক দিক বিবেচনায় বারেকা খাতুন কানিজের বাসায়ই শেষ ক’টাদিন থিতু হতে চান। তাই গ্রামে স্বামীর ভিটা-বাড়ি বা ছেলে-মেয়েদের শহরের বাসায় আর যান না। তবে তিনি না যাওয়াতে ওরা সবাই যে ফাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে এটা তিনি বেশ ভাল করেই বুঝতে পারেন।

কিন্তু এরই মধ্যে বারেকা খাতুন নানা অসুখ-বিসুখের আক্রমনে কাবু হয়ে শয্যা নিয়েছেন। আর এ রক্ত মাংসের শরীরেরই বা দোষ কি! জীবনের ঘানী টানতে টানতে শরীরের সব কল-কব্জাই এখন লক্কর-ঝক্কর পুরনো মাল গাড়ির মতো হয়ে গেছে। আজ হার্ট তো কাল কিডনী। পড়শু ফুসফুসতো পরের দিনই পাকস্থলী ও লিভারের যতসব জটিলতা ক্ষুদার্থ হাঙ্গরের মতো হাঁ করে থাকে। প্রতিদিনই বিগড়ে যায় কোনো না কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ; এর সাথে প্রাত্যহিত জীবনের সহযাত্রি উচ্চরক্তচাপ আর আশৈশবের হাঁপানী তো হাঁড়ভাঙা হাতের মতো ললাটের কাঁধে ঝুলে আছেই। একজনমে নব্বই বছরতো আর কম কথা নয়। দশ পেড়ুলেই এক’শ।

কিন্তু এবার যেভাবে আক্রান্ত হয়েছেন, এমন জটিল কোনো রোগে এর আগে আর আক্রান্ত হননি বারেকা খাতুন। দু’দিন আগে তিনি একবার রক্তবমি করছেন। এ অবস্থা দেখে কানিজ তার স্বামী বেশ ঘাবড়ে গেছে। আবার একই অবস্থা ঘটেছে আজও। হঠাৎ করেই রাত সাড়ে বারটার দিকে রক্তবমি করে বিছানাপত্র, কানিজ ও আতিকুর রহমানের জামাকাপড় ভিজিয়ে একাকার করে ফেলেছেন। একে তো মধ্যরাত; তার মধ্যে সবাই ঘুমচোখে এমন বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় আতিকুর রহমান এক প্রকার বাধ্য হয়েই সকল শালা-সমুন্দি ও ভায়রা ভাইদের খবরটা জানায়। এতরাতে ফোন করার জন্য কেউ কেউ আতিকের প্রতি বিরক্তিও প্রকাশ করেছে। আতিকুর স্ত্রীকে এ কথা জানালে কানিজ আপত্তি জানিয়ে বলেছিল-
সবাইকে এত খবর দেওয়নের কি আছে! যারা অসুস্থ বিধবা মা কে মাঝে মধ্যে আইসাও একবার দেইখ্যা যাইতে পারে না বা একটা ফোন করে মায়ের ভাল-মন্দের খবরাখবর নিতে পারে না। সব সময় নিজেদের নিয়া নিজেরা ব্যস্ত থাকে। আবার হিল্লি¬-দিল্লী ঘুইরা বেড়ায়, আবার মায়ের অসুখ বিসুখের খবর দিলেও বিরক্ত হয় তাগরে খবর দিয়া কি লাভ?
কানিজের এ কথার প্রেক্ষিতে আতিকুর রহমান বলেছিল-
আসলে এটা তোমার অভিমানের কথা। হঠাৎ করে যদি মা’র একটা কিছু হয়ে যায়, সবাই তখন আমাদের দোষাদোষি করবে। এ ব্যাপারে আমি কোনো দায় নিতে চাই না।
স্বামীর এ কথায় কানিজ আরো উত্তেজিত হয়ে বলেছিল-
ওদের সাথে আমাদের এত দায় কিসের? আমরা এদের মতো এত অমানুষ হইতে পারি নাই বইল্যা ঐ তো আম্মা এতদিন বাইচ্যা আছেন। না হইলে আম্মা কবেই ঐ তো মরতে বইছিল। তখন তুমি যদি মায়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুইলা না নিতা, তা হইলে আম্মাকে বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা হইয়া ঐ মরতে হইতো। এ কথা বলেই কানিজ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেছিল।
স্ত্রীকে শান্তনা দিয়ে আতিকুর রহমান বলেছিল-
তুমি এত ভেঙে পড়ছ কেন; আমরাতো আছি। যেহেতু সবাইকে খবর দিয়েছি ওরা এলে আম্মার চিকিৎসার কি ব্যবস্থা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করবো। তারা যদি মা’র কোনো উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে, তা হলে দেশে হোক না ভারতেই হোক মা’র চিকিৎসার ব্যবস্থা আমিই করাবো।
স্বামীর কথা শেষ হলে চোখ মুছতে মুছতে কানিজ চলে যায় মায়ের ঘরের দিকে। আতিকুর রহমানও যায় কানিজের পিছু পিছু।
বারেকা খাতুনের রুগ্ন শরীরটা বিছানার সাথে কেমন লেপ্টে আছে। মায়ের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত রাখতেই বারেকা খাতুন চোখ মেলে তাকান। মায়ের এ অবস্থা দেখে কানিজের ভেতরটা কষ্টে দুমড়ে মুচড়ে যায়। মায়ের এমন অসহায় চাহনী দেখে বিষাদে কেমন টইটম্বুর হয়ে যায় তার মনটা। মায়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কানিজ বলে-
আম্মা এখন কেমন লাগছে আপনার।

ভালমন্দ কিছুই যেন বলতে পারেন না বারেকা খাতুন। শুধু নির্বিকার চেয়ে থাকেন মেয়ের চোখের দিকে। তাঁর দু’চোখ সহসাই অশ্রুতে টলমল করে ওঠে। চোখের কোণে অশ্রুকণা জমে চিকচিক করে। মায়ের সে চোখের চাহনীতে যত না বলা কথা যেন ছবি হয়ে ভেসে ওঠে চোখের সামনে। তিনি যেন কানিজকে ব্যাকুল কান্নায় বলতে চাচ্ছেন-‘মারে তোরা আমারে বাঁচা। আমি বাঁচতে চাই। আমি আরো অনেক দিন বাঁচতে চাই।’ মায়ের চোখের জল দেখে কানিজ ও নিজের অশ্রু বাঁধা দিয়ে রাখতে পারেন না। হুফিয়ে হুফিয়ে কাঁদতে থাকে। আতিকুর রহমান পাশের ঘর থেকে প্রেসার মেশিনটা এনে বারেকা খাতুনের বাহুতে লাগিয়ে পাম্প করে বাতাস ছেড়ে দিতে দিতে বলে-
মা’কে এখনই একটা প্রেসারের ঔষধ খাইয়ে দাও।

কানিজ মায়ের বিছানার পাশে রাখা ঔষধের বাক্স থেকে ট্যাবলেট বের করে খুব কষ্ট করে একটা ট্যাবলেট খাইয়ে দেয়। বারেকা খাতুন যেন পানিটুকুই গিলতে পারছেন না। কানিজ মায়ের মুখ হা করিয়ে দেখে-ট্যাবলেটটা জিভের কাছেই আটকে আছে। নিজের আঙ্গুল দিয়ে ট্যাবলেটটা ভেতরে ঠেলে দিয়ে আবার মুখে পানি দেয় কানিজ। ঠিক মতো হা করতে পারে না বারেকা খাতুন। শরীরের কোনো শক্তি বল অবশিষ্ট নেই। শেষবার রক্তবমি করার পর বিছানা থেকে আর উঠতেই পারছেন না তিনি সারাটা শরীর কেমন রক্তহীন শাদা হয়ে গেছে। বিছানাতে প্রস্রাব-পায়খানা করছেন। তবে দিনে দু’দিনবার প্রস্রাব করলেও পায়খানা হয়না আজ তিনচার দিন ধরে। পায়খানা করতে যতটুকু শক্তির প্রয়োজন তা ও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে তাঁর। এডাল্ট প্যাম্পাস পরিয়ে রাখার করণে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। তবু ঘরের বাতাসে কেমন একটা উৎকট গন্ধের ওড়াওড়ি টের পাওয়া যায়। কানিজ বেডসাইট ড্রয়ার থেকে এয়ার ফ্রেসনার বের করে সারা ঘরে একবার ¯েপ্র করে মায়ের দিকে তাকায়। অল্প সময়ের ব্যবধানে কেমন অসাড় হয়ে পড়েছেন তিনি। এ মূহুর্তে শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠা-নামা বুঝতে পারছে না কানিজ। মায়ের বুকে কান পেতে হার্টের শব্দ শুনার চেষ্টা করে সে। না। হার্ট চলছে, তবে যেভাবে চলছে তাকে গতিহীন খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা ছাড়া আর কি ই বা বলা যায়।

বারেকা খাতুনের বর্তমান শারীরিক যে অবস্থা এটাকে ‘কোমা’ বলা না গেলেও ‘কোমার’ কাছাকাছি বলা যায়। এখন শুধু ক্ষণগণনার পালা। এমন অবস্থায়ও মানুষ তার স্বজনটিকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়। যা করে যাচ্ছে কানিজ তার মায়ের জন্য। কানিজের অন্যান্য ভাই-বোনদেরও খবর দেয়া হয়েছে। হয়তো আজ দুপুরের মধ্যে অনেকেই চলে আসবে। তবে সেঝজনকে মোবাইল ও ল্যান্ডফোন কোনোটাই পাওয়া যায়নি। মায়ের এমন খবর শুনে কেউ না এসে থাকতে পারে না। মায়ের এ অবস্থাতেও কানিজকে বিরাট লটবহরের খাবারের আয়োজন করতে হচ্ছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে দেখে যাচ্ছে মায়ের অবস্থা। তাছাড়া ছোট ছেলে পান্না ও মেয়ে রুমি তো পাশের ঘর থেকে সব সময়ই কান খাড়া করে রাখে; নানীর ঘরে কোন কিছুর নড়াচড়ার আওয়াজ হলো কি না।

বাবুর্চি মহিলাকে দুপুরের সব রান্না-বান্নার নির্দেশ দিয়ে কানিজ এসে ঢুকে আবার মায়ের ঘরে। সুস্থ্য থাকতে মা যে রকিং চেয়ারটাতে বসে চোখ বন্ধ করে মাঝে মাঝে দোল খেত; সে চেয়ারটাতে গিয়ে বসে কানিজ। সে ও মা’র মতো দু’চোখ বন্ধ করে হাতলে দু’টি হাত রেখে, দুলতে দুলতে চলে যায় সে দূর অতীতে।

বাবা হাসেম আলী মাস্টার আর এই মা বারেকা খাতুন কত কষ্ট করে আট আটজন সন্তানকে মানুষ করেছেন। ছেলে-মেয়েদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। তখনকার যুগে এতগুলো সন্তানকে মানুষ করা এতটা সহজ ছিলনা। একজন শিক্ষকের বেতন তখন কতই বা ছিল। জমির ফসল ও স্বল্প বেতন দিয়ে কখনো ভরপেট কখনো আধাপেট খেয়ে, অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে প্রত্যেককেই প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। চার মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছেন ভাল বর ও ভাল ঘর দেখে। কিন্তু নিজেদের কষ্ট ও অভাব অনটনের কথা ছেলে-মেয়েদের তারা বুঝতে দেননি কখনো। এত কষ্টে মানুষ করা সন্তানরাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েও মা-বাবার অনন্ত ত্যাগ ও অপরিসীম কষ্টের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে নিজেদের আরাম-আয়েস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা বুঝতে চেষ্টা করেন না, ডিম আগে না মুরগী আগে। এতগুলো ভাইবোনকে মানুষ করতে গিয়ে মা একজন কাজের লোকও রাখেননি ঘরে। সবকাজ মা একাই সামলেছেন। মায়ের সে যে কি হাড়ভাঙা খাটুনি তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করার মতো না। কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে ওঠেই সে যে কাজে লাগতেন, রাতে ঘুমানো আগ পর্যন্ত যেনো এইটুকু অবসর ও মিলতো না একটু বিশ্রামের। যৌবনে কোনো রোগ-শোককে পাত্তা না দিলেও সেব সব রোগ-শোকই শেষ বয়সে এসে বিগড়ে বসেছে। ছেলে মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করে বিয়ে-শাদী দিয়ে যেইনা সুখের মুখ দেখা শুরু করেছিলেন, তখনই টুপ করে মরে গেল বাবা। ছেলে-মেয়েরা যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু মা হয়ে গেলেন একেবারে একা। শুধু একা নন, হয়ে গেলেন একেবারে নিঃস্ব। সবার অবহেলার পাত্র। এতোগুলো ছেলে মেয়ের মধ্যে কেউ একা মায়ের দায়িত্ব নিতে চাইলো না। ভাবখানা এমন ছিলো উনিতো কারো একার মা নন, সবারই মা। সুতরাং সবাইকেই মায়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে। মা হয়ে গেলেন তখন‘ভাগের’ মা। শুরু হলো মায়ের অন্য এক জীবন। স্রোতের শ্যাওলার মতো আজ এ ঘাটে তো কাল ওঘাটে। এভাবে ঘুরে ঘুরে মা একেবারেই ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়লেন। শেষে এসে আশ্রয় খুঁজলেন এই কানিজের কাছে। সে ই কাঁধে তুলে নিল মায়ের সব দায়িত্ব।

মেয়ে রুমীর ডাকে কানিজের ভাবনাগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। মা তাড়াতাড়ি আস। বড় মামা ও মামী এসেছেন।
কানিজ ঘরে এসে ওদের দেখে কানিজের মনে হলো ওরাই যেনো আসুখে বিসুখে আরো বেশি কাবু হয়ে আছে। ভাই-ভাবীকে কদমবুছি করে যেইনা কানিজ বলেছে, কেমন আছেন দাদা!
তখনই বড় ভাই জাহেদ সরকার বলে- আর আমাদের থাকা…। এই কোন রকমে বাইচ্যা আছি আর কি। আর তোর ভাবীর ও সেই পুরান রোগটা আবার মাথাচারা দিয়া উঠছে। কোন চিকিৎসা ফিকিৎসাই আর কাজ হইব বইলা মনে অয় না। ভাইয়ের কথা শুনে কানিজ ভাবীর দিকে তাকাতেই মনে হলো ওনি যেন মরার আগেই মরে গেছেন।
কানিজের খুব রাগ হলো। যে অসুস্থ্য মাকে তারা দেখতে এসেছেন, তার সন্মন্ধে কোনো কথা জিজ্ঞেস না করে নিজেদের রোগ-শোকের ফিরিস্তি তুলে ধরতে যেনো ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বোনের মনের কথা যেন মুহূর্তেই পড়ে নিলেন জাহেদ সরকার। তাই নিজের কথা ঘুরিয়ে দিয়ে বলেন-
আম্মার এমন কি হলো যে এমন গভীর রাতে খবর দিতে হলো। আমি তো মনে করেছি না জানি আম্মার কি হয়ে গেল। একেতো নিজের হার্টের রোগ, এমতাবস্থায় এমন খবর শুনলে কি আর স্থির থাকা যায়।
কানিজ অনেকটা তির্যক সুরেই বলে-
আপনাদের অস্থির করার জন্য তো সে আপনাদের ফোন করে নাই। সে তো পরের ছেলে। হঠাৎ করে আম্মার যদি একটা কিছু হইয়া যায়’ আর আপনাদের খবর না দেয় তা হইলে তো শত কথা শুনতে হইত তাকে।
না না আমি সে কথা বলি নাই। আম্মার অবস্থা কি খুব বেশি খারাপ। জাহেদ বলে।
আসছেন যখন দেখেনই না গিয়া আম্মার অবস্থা কেমন। আম্মাতো ভিতরের ঘরেই আছেন।
ছোট বোনের একথাটায়ও যে শ্লে¬ষ মিশ্রিত তা বুঝতে দেরি হয়না জাহেদ সরকারের। সাথে সাথেই স্ত্রী দিলতাজকে তাড়া দেন-
চল! চল! আম্মারে দেইখ্যা আসি।

তারা যখন ওঠতে যাবে তখনই মাইক্রোবাসে করে বড়বোন তার ছোট ছেলে, মেঝ ভাই ভাবী ও ছোট ভাই ও তার বড় মেয়ে নায়লা এসে হাজির । ছোট বোন আসতে পারেনি অফিস থেকে ছুটি পায়নি বলে। বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই সবার মধ্যেই কেমন এক মেকী অস্থিরতা। ‘কোথায় আম্মা! আম্মা কোন ঘরে।’ প্রায় সবাই সমস্বরে বলতে থাকে। কানিজ সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যায় মায়ের ঘরের দিকে। তাদের অনুসরণ করে জাহেদ সরকার ও দিলতাজ বেগমও।
বারেকা খতুন ঘুমিয়ে আছেন। কানিজ মাকে হালকা ধাক্কা দেয়-
আম্মা! আম্মা আপনাকে দেখতে সবাই এসেছে। একটু এ দিকে ফিরে তাকান আম্মা। দুইবার ডাকার পর বারেকো খাতুন একটু পাশ ফিরে তাকাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ফিরতে পারছেন না। কানিজ পাশ ফিরতে সাহায্য করে মাকে। পাশ ফিরেই দু’চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইর দিকে তাকান তিনি। তাঁর দু’চোখ অশ্রুতে ঝাঁপসা হয়ে যায়। কানিজ নিজের শাড়ির আচল দিয়ে মায়ের চোখের পানি মুছে দেয়। মুছতে না মুছতেই দু’চোখ আবার ভিজে ওঠে। বারেকা খাতুনের এ অশ্রু, আবেগ, অভিমান নাকি কষ্টের তা বুঝা না গেলে জীবনের শেষ যাত্রায় এটা যে শেষ বিদায়ের অশ্রু তা যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবাই তাকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করছে, কিন্তু তিনি একেবারে নির্বিকার। নির্লিপ্ত। কারো প্রশ্নেরই কোনো উত্তর নেই। মুহূর্তেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলেন তিনি।
কানিজ বলে-
মার হয়তো কষ্ট হচ্ছে, চলেন, সবাই ওইঘরে চইলা যাই। আপনার কেউ যদি গোসল করতে চান তা ও করতে পারেন। না হলে হাত-মুখ ধূয়ে আসেন। আমি টেবিলে খাবার দেই।
মেঝ ভাই সাজেদ কানিজকে বলে- খাওয়া-দাওয়ারা এতো তাড়া কিসের। আতিক আসুক সবাই এক সাথেই খাই।
না, তার অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করে লাভ নাই। তার আসার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই। আসতে আসতে চারটা পাঁচটা বাইজ্যা যায় প্রায়ই। আপনারা সবাই খেয়ে দেয়ে একটু আরাম করেন। আমি যাই। বলেই কানিজ চলে যায়।
দুপুরের খাবার-দাবার শেষে সেই যে সবাই ঘুম দিয়েছিল, ওঠেছে ঠিক মাগরিবের আযানের পর। এরই মধ্যে মায়ের ঘরে কেউ সামান্য উঁকি দিয়েছে, আবার কেউ তারও প্রয়োজন মনে করেনি।
সবার একসাথে জায়গা হবে না, তাই ড্রয়িং রুমে সবাইকে সন্ধ্যার চা-নাস্তা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মায়ের চিকিৎসার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, তার আলোচনা ও এখানে নেয়া যাবে। কানিজ সবার প্রতি বিরাগভাজন হলেও যেহেতু সবাই এখন তার বাড়ির মেহমান, সে হিসাবে মনের কষ্ট গোপন করেই সে সব কিছু সময়ে সময়ে করে যাচ্ছে। তাছাড়া সবাইতো একই মা-বাবার সন্তান, শুধু সময়ই তাদের মধ্যে দূরত্বের দূরত্ব বাড়িয়েছে। সবাইকে চা-নাস্তা পরিবেশন করতে করতে কানিজই তার স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলে-
তুমি কি সেঝ ভাইকে পাও নাই ?
না, ল্যান্ড ফোন বা মোবাইল ফোনে কোথাও তো ভাইজানকে পেলাম না। বাসার ল্যান্ডফোনে কেবল রিং এর পর রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ ধরছে না। আর মোবাইল ফোনে তো সেই রেকর্ড করা একই শব্দ আপনার কাঙ্খিত নাম্বারটি এ মুহূর্তে বন্ধ আছে…আতিকের কথা শেষ না হতেই মেঝ ভাই সাজেদ অনেকটা তাচ্ছিল্যের মতো করেই বলে-
তাকে কোথায় পাবে? দেশে থাকলে তো পাবে।
কানিজ বলে-
দেশে নাই মানে?
সে তো এখন ইন্ডিয়া। সে শালা-সমুন্দি, শালিকা ও ভায়রা ভাই সবাইকে নিয়ে ইন্ডিয়া বেড়াতে গেছে। স্বামীর মুখ থেকে কথাটা একরকম কেড়ে নিয়ে সাজেদের বউ সাফিয়া বলে-
এ’দের এখন অনেক সুখের দিন। ঠাকা পয়সারও অভাব নেই। যখন খুশি যেখানে-সেখানে যেতে পারছে। এই তো মাস দুয়েক আগে সাজেদ ভাই তাসনিমকে নিয়ে মালশিয়া থেকে বেড়িয়ে এসেছে।
তাদের মুখের ওপরই কানিজ বলে ফেলে-
সবার তো সবই চলে। শুধু মায়ের বেলায় হলেই নানা অযুহাত। অফিসের ছুটি নাই। অমুকের তমুকের ইস্কুল। না হয় অসুখ বিসুখের কথা বলে ক্যাঁ কে্যাঁ করে। অথচ ঢাকা থেকে মাত্র এক ঘন্টার পথ গৌরীপুর এসে বৃদ্ধা, অসুস্থ্য মা কে দেখে যেতে পারে না। কানিজের এ কথায় যেন আতে ঘা পড়ে। বড়জন বলেন-
সবাই বলতে তুমি কার কার কথা বুঝাইতে চাও।
না দাদা, আমি কারো কথা বুঝাইতে চাই না। শুধু মায়ের অদৃষ্টের কথাই বলতে চাই। নিজের জীবনে এত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে আমাদেরকে মানুষ কইরা গেল। কিন্তু তাঁর এ দুঃসময়ে এখন ওনি হয়ে গেছেন সবারই বোঝা। ওনি মরলেই যেন সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।

আতিকুর রহমান, স্ত্রীকে ধমক লাগায়। তুমি থামবে। এখন কি এসব কথা বলার সময়?
স্বামীর কথা পিঠে কানিজ আর কিছু বলে না। তার চোখের পাতা বিষাদের নোনা জলে ভরে ওঠে। সে চোখ মুছতে মুছতে ঘরের কোণে একটা মোড়ায় বসে মুখ ঘুরিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। এ চাপা বোবা কান্নায় বার বার হেচকী ওঠছে তার। স্ত্রীর এ বিষাদ ও বিষন্নতা যেন ক্ষণিকের জন্য হলে আতিকুর রহমানের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সে বলে-
আসলে সেতো সবসময় মায়ের পাশে পাশে থেকে তাঁর হতাশা ও কষ্টগুলোকে নিবিড়ভাবে দেখে; তাই হয়তো সে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে। আম্মাকে আমি যতটুকু দেখেছি, তাতে মনে হয় অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। ওনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ইমিডিয়েটলি ঢাকায় কোন বড় ডাক্তার দেখাতে হবে। দুইবার রক্তবমি করার পর, ওনার এ্যানিমিয়া দেখো দিয়েছে, আরো একবার এমনটা হলেই আর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। এখন এসব আবেগের কথা বাদ দিয়ে আম্মাকে কি ভাবে খুব দ্রুত ঢাকা নেয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে।
বড়ভাই জাহেদ বলে- ঢাকা নিতে হলে আপাততঃ জাহেদ তোর বাসায়ই আম্মাকে নিয়ে যা। না হয় ডাক্তার যদি বলে পরে না হয় কোনো প্রাইভেট হাসপাতালে নেয়া যাবে।
বড়ভাইয়ের এমন প্রস্তাব শুনে সাজেদ অনেকটা ক্ষ্যাপে যায়-
আমার এমন ছোট বাসায় আম্মাকে কোথায় রাখবো! তাছাড়া লিয়নেরও আগামী মাসে পরীক্ষা। তা ছাড়া সাফিয়াও আজ কিছুদিন হলো একটা স্কুলে যোগদান করেছে। ছেলে মেয়েদের একটার পর একটা পরীক্ষা। এমন অবস্থায় আপনি কি করে আমার বাসায় অসুস্থ্য মাকে নিয়ে যেতে বলেন। বড়ভাই যেনো একটু ভাবনায় পড়ে যান। বোনদের মধ্যে সবার বড়জন অর্থাৎ জাহেদ সরকারের পিঠেপিটি ফাতেমাকে উদ্দেশ্য করে আবার বলেন-তো ফাতেমা তোর বাসায় মাকে অপাততঃ নেয়া যায় না!
কথাটা শুনেই ফাতেমা ফোঁস করে ওঠে। এটা যেন কোনো প্রস্তাব দেয়া নয় একেবারে সাপের গর্তে হাত ঢুকিয়ে দেয়ার মতো একটি ব্যাপার । সে অনেকটা উত্তেজিত হয়েই বলে-
আপনে প্রস্তাব দেয়ার কে? আপনে যে আমাদের সবারই ভাগের সম্পত্তি একাই ভোগ করে খাচ্ছেন, তো আপনি কয়দিন মাকে বাড়িতে নিয়ে রেখেছেন। আপনাদের ব্যবহারের কারণে আম্মা স্বামীর ভিটায় গিয়েও থাকতে পারেন না।
ছোট বোনের এ কথা শুনে জাহেদ সরকার যেনো বজ্রাহত হন। তিনি একেবারে থ বনে যান। চুপ করে থাকেন কতক্ষণ। কিন্তু নিজের ক্রোধ সামলাতে না পেরে গজগজিয়ে ওঠেন-
ঘুষের পয়সায় খুব ফুটানী বাইরা গেছে তর। কারে কি বলতে হইবো তাও ভুইল্যা গেছছ। আমারে তো পাইছচ নরম, তাই আমারেই মুখে যা আসে বলতে পারছ। মনে রাখিছ এত অহংকার ভালা না।
দেখ লোকটার এত বয়স হয়েছে, কিসের মধ্যে কি বলে। আমার জামাই ঘুষ খেলে তো আপনার কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। আর আপনের তো ঘুষ খাওয়ার যোগ্যতাও নেই। ফাতেমার এ কথায় জাহেদ সরকার সাক্ষী মানে ছোটভাই মাজেদকে।
হুনসস তোর বইনের কথা। কেমন বেয়াদপের মতো কথা বলে।
কিন্তু ছোট ভাই মাজেদ যেনো কোনো কিছু না বলে দর্শকের ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছে। কোন কথা বলতে গিয়ে আবার নিজে তোপের মুখে পড়ে। তাই এ মূহুর্তে বোবার চরিত্রের রুল পে¬ করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছে সে।

সবার এমন দায় এড়ানোর অবস্থা দেখে আতিকুর বলে-
আপনাদের যেহেতু সবারই সমস্যা ও অসুবিধা তা হলে এখান থেকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে আম্মাকে ঢাকা নিয়ে যাই। ডাক্তার দেখিয়ে আবার এখানেই নিয়ে আসবো। কিন্তু ডাক্তার যদি হসপিটেলাইজড করতে বলেন, হাসপাতালে আম্মার সাথে কে থাকবে, তার ব্যবস্থা করুন। কিন্তু একেজন একেক সমস্যার কথা বলছে। সবার এ দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলে কানিজ ক্ষুব্দ হয়ে ওঠে। সে উচ্চস্বরে বলতে থাকে-
থাক। ওদের কারো কোনো দায়িত্ব নেবার দরকার নেই। তুমি ফোন করে গাড়ির ব্যবস্থা করো, আজ রাতের মধ্যেই আম্মাকে ঢাকা নিয়ে যাব। আমিই আম্মার সাথে হাসপাতালে থাকবো।

কানিজের এ কথায় অন্য সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। আতিকুর মোবাইলে রেন্ট-এ কারের ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই মূহুর্তেই মায়ের ঘর থেকে রুমীর চিৎকার ভেসে আসে-
আম্মা! আব্বা!, তোমাদের এসব প্যাচাল বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি এই ঘরে আস। নানী যেন কেমন করছে। রুমীর চিৎকার শোনে সবাই দৌঁড়ে আসে বারেকা খাতুনের ঘরে। বারেকা খাতুন কেমন এক অস্থিরতায় ছটফট করছিলেন। ঘরে এসে মায়ের এ অবস্থা দেখে সবাই ঘাবড়ে যায়। কানিজ মাকে ঝাপটে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তখনই বারেকা খাতুনের আবার রক্তবমি শুরু হয়। বমির সাথে ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসতে থাকে জমাটবাাঁধা রক্তের টুকরো। এ অবস্থা দেখে কান্না শুরু করে আকিকুর রহমানও। কিছুতেই আর রক্তবমি বন্ধ হচ্ছে না। সবার চিৎকার কান্না শুনে আশপাশের বাসা-বাড়ির মানুষজন এসে ভিড় করতে থাকে কানিজদের বাসায়।

আতিকুর রহমান কাঁদতে কাঁদতে বলে-
চলেন, আম্মাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ঢাকা চলেন। ছেলেকে ডেকে বলে-যা পান্না, এক্ষণি একটা গাড়ির ব্যবস্থা কর। তোর নানীকে ঢাকা নিয়ে যেতে হবে।
পান্না বাবাকে শান্তনা দেয়-
বাবা তুমি অস্থির হয়ো না। আমি এক্ষণি গাড়ির ব্যবস্থা করছি।
পান্না দ্রুত বেরিয়ে যায় বাসা থেকে। তাদের বাসায় মানুষের ভিড় ক্রমেই বাড়তে থাকে। একেকজন একেক রকম পরামর্শ দিচ্ছে। তারা কার কথা শুনবে এখন।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পান্না একটা হাইয়েস মাইক্রোবাস নিয়ে আসে। সবাই ধরাধরি করি বারেকা খাতুনকে গাড়িতে উঠাতে এগিয়ে যায়। বাসার দরজা ডিঙ্গানোর আগেই বারেকা খাতুনের দেহ হঠাৎ করেই ভারি হয়ে ওঠে। আতিকুর শ্বাশুড়ির চোখে টর্চের আলো দেখে। ততক্ষণে সব শেষ। চিৎকার করে ওঠে আতিকুর রহমান।

(মোট পড়েছেন 114 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন