খোকার গেরিলা হামলার হুমকীর সাথে সাম্প্রতিক গুম-হত্যার কি কোনো যোগসূত্র আছে?

- মাহবুবুল আলম

গত কয়েকদিন যাবত দেশে যে গুম-হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলো ঘটছে তা দেখে দেশের সাধার মানুষ উৎকন্ঠিত একই সাথে আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। খোকার গেরিলা হামলার হুমকীর সাথে সাম্প্রতিক সংগঠিত গুম ও হত্যাকান্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি-না তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল ২০১৪ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির এক সমাবেশ থেকে সরকারের উদ্দেশে গেরিলা হামলার হুমকি দিয়ে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, ‘আপনাদের ভালর জন্যই বলছি। যদি স্বেচ্ছায় সরে না যান, তাহলে জনগণ চোরাগোপ্তা কর্মসূচীর মাধ্যমে আপনাদের নির্মম পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে। শুধু আহ্বানে এই সরকারের সাড়া মিলবে না, দুর্বার আন্দোলনে নামতে হবে।’ এ বক্তব্য নিয়ে দলের ভেতর ও বাইরে সাদেক হোসেন খোকা আবার সমালোচনার ঝড় তোলেছেন। তবে হঠাৎ করে খোকার এমন চোরাগোপ্তা হামলার হুমকীকে তেমন একটা গুরুত্ব না দিলেও হিসাবের মধ্যে রাখছে সরকার । তবে তাদের ধারণা নির্বাচনে না এসে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছে বিএনপি। জনসমর্থন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে রাজপথের আন্দোলনের পরিবর্তে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরকে নিয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে হতাশ নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে চায়। সরকারী দলের নেতারা বলছেন ‘রাজনীতির নামে কোন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড আর মেনে নেবে না। যেখানেই সন্ত্রাসের চেষ্টা করা হবে, সেখানেই কঠোরহস্তে দমন করা হবে’।
এ প্রসংগে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, এটা কোন গণতান্ত্রিক ভাষা নয়। সাদেক হোসেন খোকার বক্তব্যেই প্রমাণ হয়েছে, বিএনপি এখন আর কোন রাজনৈতিক দল নয়, সন্ত্রাসী দলে পরিণত হয়েছে। বিএনপি জানে তাদের আন্দোলনে জনগণ সাড়া দেবে না। তাই তারা সন্ত্রাসী পথে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে।’

বাংলাদেশের যারা সচেতন নাগরিক তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২৫ অক্টোবর ২০১৩ আওয়ামী লীগের তখনকার সরকারের মেয়াদ পূর্তির দিন বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকা সরকার পতনের জন্যে দা-কুড়াল-বল্লম-কালতা-জুইত্যা নিয়ে কর্মীদের রাজপথ দখলের নির্দেশ দিয়ে সমালোচনার ঝড় তুলেছিলেন। একই সাথে এ হুমকী দিয়ে বিএনপির মহানগরের নেতাকর্মীদের আন্দোলনের মাঠে একা ফেলে তিনি অজানা গন্তব্যে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। তখন থেকেই বিএনপির অনেক বিক্ষুব্দ নেতাকর্মী তাকে ‘বল্লম খোকা’ নামে ডাকা শুরু করে। এর পর থেকে নেতাকর্মীরা তাকে আর আস্থায় নিতে পারেনি। সে হারানো আস্থা পুরুদ্ধারের জন্যই কিছুদিন আগে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তার সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ হয়েছে কি না তা কেউ জানে না। তবে দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাদের সবাই বলছে যিনি বা যে নেতা বড় নেতা সাজার জন্য স্ট্যান্টবাজী করে নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে পালিয়ে যান তিনি কখনো নেতা হতে পারেন না। নেতার কাজই হলো একজন সেনাপতির মতো; যুদ্ধের ময়দানে থেকে তার বাহিনীর সদস্যদের মনোবাল চাঙা রাখা। সে ক্ষেত্রে সেনাপতিই যদি আত্মরক্ষার জন্যে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যান তাহলে সে সেনাপতির প্রতি আর কখনো আস্থা স্থাপন করতে পারেনা নিয়মতান্ত্রিক বাহিনীর কোনো সদস্যই।

যাক সে কথা, কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর লাইম লাইটে আসার জন্যই কি তিনি আবার সরকার হটানোর জন্য গেরিলা হামলার হুমকী দিচ্ছেন? তার এ হুমকী দলীয় ফোরামেই সমালোচিত হচ্ছে। বিএনপিতে সাদেক হোসেন খোকা বিরোধী শিবির আগে থেকেই শক্তিশালী, খোকাবিরোধীরা তার এ বক্তব্যকে লুফে নিয়ে বলাবলি করছে, দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের আবার বিপদে ফেলার জন্য খোকা এসব স্ট্যান্টবাজী করছে। তাই অযথাই সরকারের হাতে নেতাকর্মীদের ধরপাকড়ের জন্য একটি অস্ত্র তুলে দিলেন খোকা। আর দলের বাইরে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল নাগরিক সমাজ মনে করছে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পতনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপির মতো একটি দলকে সরকারকে হটাতে গেরিলা হামলার হুমকী দিতে হচ্ছে এ ধরনের হটকারী বক্তব্য খুবই দুঃখজনক। কেননা, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি এখনো তেমন কোনো জোরালো আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেনি যে আল্টিমেটাম দিতে দিতে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে গেরিলা বা চোরাগোপ্তা হামলার হুমকী দিতে হবে। তাই বিএনপি বিরোধীরা ও সরকারপক্ষ মনে করছে সাদেক হোসেন খোকার এ বক্তব্যের মাধ্যমে বিএনপির গোপন পরিকল্পনার কথা ফাঁস হয়ে গেছে।

আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে খোকার এ ধরনের বক্তব্য বিএনপির দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। তারা সরকার তথা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কাছে বার বার মার খেয়ে চরম হতাশা থেকেই এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে। এ হতাশা থেকেই রাজপথের আন্দোলনের নয়, জামায়াত-শিবিরের মতো চোরাগোপ্তা কর্মসূচীর মাধ্যমে সরকার পতনের হুমকি দিয়ে থাকতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন প্রকাশ্য রাজনীতির বদলে বিএনপি এখন সন্ত্রাস নির্ভর দলে পরিনত হয়েছে।

খোকার এমন হুমকীর ঘটনায় মানুষের মধ্যে আবার নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। আগের দা-কুড়াল-বল্লম-টেটা-জুইত্যা ও কালতার হুমকীর কারণে খোকার বিরুদ্ধে মামলা হয়, সে মামলায় তাঁকে গ্রেফতারও হতে হয়েছিল। পরে জামিনে বেরিয়ে এসে দলে নিজের অবস্থা সুদৃঢ় করার লক্ষে চোরাগোপ্তা পথে সরকার পতনের হুমকী দিলেন খোকা। দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের চোরাগোপ্তা হামলা, নাশকতা ও সহিংসরূপ সচোক্ষে প্রত্যক্ষ করেছে এদেশের জনগণ। সে সময় এ গোষ্ঠী প্রকাশ্য দিবালোকে চোরাগোপ্তা হামলা করে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্যসহ অসংখ্য মানুষকে নৃশংস কায়দায় কুপিয়ে-পিটিয়ে হত্যা করেছে, ট্রাক-বাস-সিএনজি চালকের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাদের হত্যা করে উল্লাস নৃত্যে মেতে ওঠেছিল। তাদের এ অগ্নিউৎসবের নৃশংসায় কতশত মানুষ যে আগুনে পুড়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছে তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। কিন্তু এত তান্ডব নৃশংসতা চোরাগোপ্তা হামলা-সহিংসতা চালিয়ে শত শত মানুষ মেরেও নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি বিএনপি-জামায়াত ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী।

১ মে ২০১৪ ‘চোরাগোপ্তা হামলার হুমকি?’ দৈনিক জনকন্ঠের সম্পদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে ‘আমরা মনে করি, যে কোন সহিংসতা থেকে জনগণের জানমাল রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। এই ধরনের হুমকি দেশকে বড় ধরনের নাশকতা-সহিংসতার পথে নিতে পারে। প্রতিবাদ মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। গণতান্ত্রিকপন্থা অনুসরণ করে অভিযোগ বা দাবি উত্থাপনই সমীচীন। প্রতিবাদে উত্তেজিত হয়ে নাশকতামূলক কর্মকান্ডের হুমকি দেয়া গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। এই ধরনের হুমকি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত দাবির গ্রহণযোগ্যতা হারায়, দাবিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর এই ধরনের হুমকি বা বক্তব্য কোন দায়িত্বশীল নেতা বা ব্যক্তির কাছ থেকে দেশের জনগণ প্রত্যাশা করে না।’

গতকাল এক সহযোগী দৈনিকে স্বদেশ রায় তার এক নিবন্ধে বলেছেন ‘সাদেক হোসেন খোকা কখন এ কথা বললেন, যখন, দেশব্যাপী পরিকল্পিত গুম ও খুন করার কাজ শুরু করেছে জামায়াত-শিবির। এ সময়ে এ কথা বলার অর্থই হলো, জামায়াতের কর্মকা-কে বা যা তারা করতে চাচ্ছে ওই কাজে যেন বিএনপি কর্মীরা সহায়তা করে সেটা জানিয়ে দেয়া। অর্থাৎ জামায়াত যে জঙ্গী তৎপরতায় নামছে বিএনপিও তার কর্মীদের সেই কাজে নামার হুকুম দিয়ে দিলেন সাদেক হোসেন খোকার মাধ্যমে।’ তাই খোকার গেরিলা হামলার হুমকীতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, আন্দোলনের মাঠে না নেমে, আন্দেলনের কোন কর্মসূচী না দিয়েই বিএনপির এ নেতা এমন হুমকী কেন দিলেন? এর পেছনে কি কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে? রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন জামায়াত-শিবিরকে ব্যবহার করে দেশে আবার অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পরিকল্পনার কথাই হয়ত মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন সাদেক হোসেন খোকা।

উপরোক্ত আলোচনার উপসংহারে এ কথা নিদ্বিধায় বলা যায়, খোকার এমন হুমকীকে রাজনৈতিক সহনশীলতার দোহাই দিয়ে অবজ্ঞা করা মোটেই উচিত নয়। এটা মেঠো বক্তৃতা বা কথার কথা মনে করলে ভুল হবে। আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় প্রদান বা রায় কার্যকরের কার্যক্রম শুরু হলে বিশেষ করে সাঈদীর চুড়ান্ত রায় ঘোষিত ও কার্যকর কালে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে বিএনপি মিলেমিশে এ ধরনে গেরিলা হামলা চালিয়ে দেশকে আবার অস্থিতিশীল করে তোলতে পারে। যা মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন খোকা।

(মোট পড়েছেন 104 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন