জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির কেন এই লুকোচুরি খেলা ?

- মাহবুবুল আলম

নির্বাচনের পর বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার দলের ফোরামে জামায়াতের সাথে আর জেট নয় এ কথা বললেও পরবর্তীতে লন্ডনের নির্বাসিত তারেক রহমানের কারণেই জামায়াতের সাথে সম্পর্ক রাখতে হচ্ছে বিএনপির। কিন্তু জামায়াতের সাথে সম্পর্ক রাখা না রাখা নিয়ে দেশের অন্যতম এ বৃহত রাজনৈকতক দলটি অনেকটাই লুকোচুরির আশ্রয় নিয়েছে। তাই দাতাগোষ্ঠী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপ সামলাতে এবং দেশের মানুষকে ধোঁকা দেয়ার কৌশল হিসেবেই জামায়াত-শিবিরকে মঞ্চের বাইরে রেখেই ২০ জানুয়ারি সমাবেশ করতে হয়েছে বিএনপিকে। তবে সেদিনের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে জামায়াত-শিবিরকর্মীদের সরব উপস্থিতি দেখা না গেলেও ঢাকা মহানগর ও পাশ্ববর্তী জেলার এবং জেলার জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নীরব উপস্থিতি ছিল চোখে পরার মতো। গত কয়েকমাস ধরে সারাদেশে জ্বালাও পোড়াও ও বিভিন্ন ধরণের নাশকতার মাধ্যমে দেশকে ধ্বংস করার অপচেষ্টার কারণে জামায়াত-শিবিরের প্রতি দেশে বিদেশে যে জনরোশ ও বিরূপ মানোভাবের সৃষ্টি হয়েছে তা সামাল দিতেই বিএনপি আপাতঃ কৌশল হিসেবে জামায়াতকে মঞ্চের বাইরে রেখে দেশবাসীসহ আন্তর্জাতিক মহলকে ধোঁকা দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।

২০ জানুয়ারির সমাবেশ সফল করার জন্য ১৮ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি বৈঠকে জামায়াতসহ সকল দলের শো-ডাউনের ব্যাপারে ঠিকঠাক থাকলেও রাতেই জামায়াত নেতাদের জনসমাবেশে ব্যানার না আনার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে এসএমএসের মাধ্যমে বলা হয়। এতে বেকাদায় থাকা জামায়াত-শিবির বিএনপির এর আচরণে ক্ষুব্দ হলেও বিষ হজম করার মতো এ সিদ্ধান্ত মেনে চলতে বাধ্য হয় এ সিদ্ধান্ত। শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আবু সালেহ মোঃ ইয়াহিয়া সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১৮ দলের কর্মসূচীতে ব্যাপক শোডাউনের প্রস্তুতি ছিল। সেখানে দেড় লাখেরও বেশি মানুষের জমায়েতের প্রস্তুতি ছিল তাদের। হেফাজতের অন্তর্ভুক্ত বিএনপির এক শরিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি একা কর্মসূচী পালন করতে চায় এটা আগে জানালেই পারত। তবে জামায়াত ছাড়া বিএনপি কোন কর্মসূচী সফল করতে পারে না, এটা সবাই জানে।

২০ জানুয়ারি জনসমাবেশে যোগদানের সর্বশেষ প্রস্ততি যখন চলছিল ঠিক তখনই বিভিন্নভাবে জামায়াত-শিবিরের নেতাদের সমাবেশে কোন ধরনের শোডাউন বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত আটক নেতাদের মুক্তি বা অন্য কোন ব্যানার, ছবি নিয়ে আসতে নিষেধ করা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবেই প্রধান প্রধান নেতাদের কাছে রবিবার রাতে বার্তা পাঠানো হয়। শিবিরের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য এক প্রভাবশালী নেতা জানান, অনুষ্ঠানের দিন সকালে জামায়াতকে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, এটি শুধু বিএনপির কর্মসূচী। সেখানে আপনাদের আসতে হবে না। কেননা, এটি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচী।

কিন্তু সবাই জানে, ১৫ জানুয়ারি হোটেল ওয়েস্টিনে ১৮ দলের নেত্রী খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করেই কর্মসূচী দিয়েছিলেন। সে হিসেবে তাদের প্রস্তুতি ছিলও ব্যাপক। সর্বশেষ রবিবার বিকেলেও গণমাধ্যমে জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে সমাবেশ সফল করতে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু রাতেই নয়াপল্টনে সমাবেশের প্রস্তুতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপন। বলেন, এটি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচী। কিন্তু কেন হঠাৎ করে করেই যেন গণেশ উল্টে গেল এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, তাই এ নিয়ে লিখে আর লেখার পরিধি বাড়াতে চাই না। তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত দলের নেতাকর্মীদের মনে কিছুটা হলেও সান্তনার প্রলেপ দিতে বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোটের ব্যানারে ২০ জানুয়ারি সমাবেশ থাকলেও প্রশাসনের অনমনীয় মনোভাব ও দাতাগোষ্ঠীর চাপে শেষ পর্যন্ত ১৯ তারিখ গভীর রাতে এসএমএসের মাধ্যমে জামায়াতকে জনসভায় ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে হাজির না হওয়ার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়ার পর রাজনীতিতে চরম বেকায়দায় থাকা জামায়াত-শিবির সুবোধ বালকের মতো বিএনপির এ নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য হয়। বাধ্য না হয়ে তাদের কোনো উপায় ছিলনা। কেননা, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। অপরদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকতে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক দল সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত, তাদের নিষিদ্ধ করা উচিত বলেও অভিমত প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্ট। ফলে বিদেশীদের এ চাপ বিএনপির পক্ষে অবজ্ঞা করার পথ ছিল না।

বিভিন্ন সংবাদপত্রের খবর ও প্রতিবেদনে জনরোশ আর বিদেশী দাতাগোষ্ঠীর দাবি অনুসারে বিএনপি জামায়াতের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে বক্তব্যই দেয়া হয়েছে। সন্ত্রাসী জামায়াত ছেড়ে সংলাপে আসতে সরকারের আহ্বান, জনরোশ আর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে জামায়াত-হেফাজত ছাড়তে বিএনপিকে পরামর্শ দেয়ার পর থেকেই চলছে আলোচনা। এ অবস্থায় ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সমাবেশে জামায়াতকে মঞ্চের বাইরে রেখে বিএনপির সমাবেশের পর আলোচনা যেন ডালপালা আরো বিস্তৃত হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে অনেক, প্রশ্ন উঠেছে জামায়াত-বিএনপির দূরত্বই সত্যি সত্যি তৈরি হয়েছে? তবে তবে এটা যে বিএনপির নতুন কৌশল তা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে চায়ের টেবিলে। অনেকেই মনে করছেন বিএনপি-জামায়াতের এ ‘দূরত্ব’ স্রেফ পরিকল্পিত ও লোক দেখানো। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিনটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দল দুটি এ কৌশল নিয়েছে। এক. আওয়ামী লীগকে নতুন নির্বাচন নিয়ে সংলাপে বসতে বাধ্য করা, দুই. জামায়াত ছাড়ার কথা বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে খুশি করা এবং জামায়াতবিরোধী হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলোকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন মোর্চায় নিয়ে আসা। তাদের মতে সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় কিছু ছোট দল জামায়াতকে নিয়ে আপত্তির কারণেই ১৮ দলের সঙ্গে আসছে না। বিকল্পধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে নিজেদের মোর্চায় অন্তর্ভুক্ত করতে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের ভান করা জরুরী হয়ে পড়েছে বিএনপির জন্য। জামায়াতের মজলিশে শূরার এক সদস্য জানিয়েছেন, সংলাপ নিয়ে সরকার ও বিদেশী কিছু দেশের শর্ত আরোপে বিএনপি বিব্রত। বিএনপি চায়, এই মুহূর্তে আলাদাভাবে আলোচনার মাধ্যমে কাজ করতে। জামায়াত-শিবিরের এ বিষয়ে আপত্তি নেই বলেও খালেদা জিয়াকে জানানো হয়েছে। কৌশলের অংশ হিসেবে ১৮ দলীয় জোটভুক্ত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকেও আপাতত আলাদা কর্মসূচী দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে বিএনপির কর্মসূচীতে দলটির (বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল) নেতাকর্মীর পরিচয়ে যোগ দিতেও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ২০ জানুয়ারি সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশেই এরই প্রতিফলন ঘটেছে। ছাত্রদল-যুবদলের পরিচয়ে ওইদিন জামায়াত-শিবির-হেফাজতের কয়েক হাজার নেতাকর্মী উদ্যানে জড়ো হয়েছিলেন। বিএনপির জামায়াতকে এড়িয়ে চলার যে খবর কিছু কিছু গণমাধ্যমে আসছে, তা এ পরিকল্পনারই অংশ মাত্র। এ পরিকল্পনার প্রধান ও প্রথম উদ্দেশ্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংলাপ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগকে চাপ দেয়া। এক্ষেত্রে বিদেশীদের খুশি করাকেই অন্যতম কাজ মনে করছে বিএনপি-জামায়াত। বিদেশীদের অনুকম্পা আদায়ে জামায়াতকে ছাড়াই দৃশ্যত পথ চলতে চাইলেও জামায়াতকে ছাড়া যে বিএনপির চলা সম্ভব নয় তা ২০ জানুয়ারির সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ থেকেই প্রমাণিত হয়েছে। সেদিনের সে সমাবেশে জামায়াত-শিবির ব্যানার ফেষ্ট্রন নিয়ে সামনের কাতারে না থাকলেও কৌশলে সমাবেশে ঠিকই হাজির হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও প্রতিবেদন থেকে সে চিত্র জানতে পেরেছে দেশের মানুষ।

দৈনিক জনকন্ঠে প্রকাশিত সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি কেন লুকোচুরি খেলা খেলছে তার বিশদ বিবরণ রয়েছে, সেই প্রতিবেদনের অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হলো: ‘সমাবেশ নিয়ে বিএনপির কৌশলের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে- স্থায়ী বিভাজন নয় বরং জামায়াতের বিষয়ে কৌশলী ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বহির্বিশ্বে কিছুটা ইতিবাচক বার্তা দেয়ার চেষ্টা করা। জামায়াতের মতো গণধিকৃত সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্য কেবল দেশে নয় বহির্বিশ্বেও সঙ্কটজনক অবস্থায় আছে দলটি। দিন দিন এ সঙ্কট আরও বাড়ছে। সরকারসহ পুরোদেশবাসী এমনকি আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের দাবি তুললেও বাধা এখন দলগতভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত। ‘আদালতে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত গণধিকৃত উগ্রবাদী জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক ও সন্ত্রাসী কর্মকা- বর্জন না করলে কোন আলোচনা নয়’ এ কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন। দেশজুড়ে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি। তাছাড়া ১৩ জানুয়ারি ঢাকায় এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা বিএনপিকে সহিংসতা এড়িয়ে চলতে বলেছেন। ১৮ দলের বৈঠকে জামায়াতকে সহিংসতা এড়িয়ে চলতে বলেছেন খালেদা জিয়াও। এর পরও শনিবার রাতে গাইবান্ধার সুন্দরপুরে আসামি ধরতে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়ায় দলটি। সেখানে পুলিশসহ আহত হয় অর্ধশতাধিক। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতকে নিলেও কৌশলী হতে চায় বিএনপি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা এখন জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীর বিচার। জামায়াত ছেড়ে বিএনপি একটা সমাবেশ করলেই সঙ্কট কাটছে না। সমঝোতাও হচ্ছে না। বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার কোন বিকল্প নেই। বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে হবে এবং বলতে হবে, আমরাও যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই। তাদের আরও বলতে হবে, ১৫ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপার্সন তার জন্মদিন পালন করবে না। এ ছাড়া সমঝোতার কোন পথ এখন আর নেই’।

কাজেই এই আলোচনা থেকে যে বিষয়টি পরিস্কার তা হচ্ছে, নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ বিএনপি জামায়াত নিজেরকে গোপনে সংগঠিত করতে এ ধরনের লুকোচুরি খেলার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। সময় সুযোগ মতো তারা আবার সিমূর্তিতে আবির্ভূত হবেই। কেননা জামায়াত ছাড়া যে বিএনপির রাজনীতিই অচল।

(মোট পড়েছেন 95 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ