সাইবার গার্ল

- মাহবুবুল আলম

গল্প
মাহবুবুল আলম

ফেসবুক লগইন করে নিজের টাইমলাইনের পাতা ভেসে ওঠতেই একটা ফেন্ডরিকোয়েস্ট দেখে ক্লিক করে লিমন। বেশ কিছুদিন আগে সাইবার গার্ল নামে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে। কিন্তু ও এখন পর্যন্ত সেটার রেসপন্ড করেনি। রেসপন্ড না করার প্রথম কারণ হলো, অনুরোধকারীর প্রফাইল কোন ছবি নেই। ছবির বদলে আপলোড করা হয়েছে একটা লাল ও একটা সাদা গোলাপের ছবি। এমনিই সচরাচর লিমন ভালভাবে না জেনে না শুনে; প্রোফাইলে ইনফরমেশন, স্টেটাসের প্রতি ইমপ্রেস না হয়ে কোন রিকোয়েস্ট কনফার্ম করে না। একেতো ছবি নেই তদুপরি ইনফোতে তেমন কোন তথ্য নেই। শুধু, নামের জায়গায় সাইভার গার্ল, জেন্ডার বা সেক্সের জায়গায় ফিমেল এটুকুই।
ইতিমধ্যে লিমনের ফেসবুক ফ্রেন্ডের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে, এখন ভালভাবে দেখে শুনে; বেছে বেছে এ্যাড বা এলাউ করে সে। বাছাবাছির প্রধান কারণ হলো যারা নিজেদের প্রোফাইলে প্রোফাইল পিকচার আপলোড করার মতো সাহস রাখেন না, এ নিয়ে রহস্য করেন তাদেরকে লিমনের একেবারে নাপছন্দ। আরে নাচতে যখন নেমেছিস, ঘোমটা খুলেই নাচ! তাছাড়া সাইবারগার্ল এটাও অনুরোধকারীর আসল নাম নয় ছদ্মনাম।
রিকোয়েস্ট একসেপ্ট বা ইগনোর কোটাই না করে সাম্প্রতিক কিছু ছবি আপলোডে মনোসংগেযোগ করে লিমন। একই সাথে ইউটিউব থেকে কিছু লেটেস্ট গান ও ছবি ডাউনলোড করতে শুরু করে। এরই মধ্যে অনলাইলে পেয়ে লিমন দেশ-বিদেশের তিন বন্ধুর সাথে চ্যাটিং শুরু করে। এদের মধ্যে সার্লি অস্ট্রেলিয়ার বন্ধু, মুরাদ বেস্ট ফ্রেন্ড। আর জিনিয়া সে হলো লিমনের পিয়ারী। যাকে সহজ বাংলায় বলে প্রেমিকা। আজ ছুটির দিন হওয়াতে অনেককেই নেটে পাওয়া যাচ্ছে। আবার নেটের গতি পাওয়াতে কথাবার্তাও চালাচালি করতে পারছে সহজেই।
তবে জিনিয়া চ্যাটিংয়ে বসে খুব একটা কুলাতে পারে না। এই হাই হ্যালো। কেমন আছো। কি করছো। খালাম্মার শরীর কেমন। বেশি রাত জেগে চেটিং ফেটিং করনা। শরীর খারাপ করবে। তো রাখলাম। ঘুমাতে যাও। এসব উপদেশমূলক কথাবার্তা। আর নেটে বলার মতো কি কথাই বাকি থাকে। মোবাইলে, সাক্ষাতে এত কথা হয় দিনে রাতে, আর কি কোন কথা তেমন বলার থাকে।
তবে সার্লি একবার পেলে জোঁকের মতো লেগে থাকে। মুখে লবণ মেখে না দিলে ছুটানো যায় না। সার্লি চ্যাটিং পেলে ও একাই চ্যাটিংয়ের বেশীরভাগ সময় খেয়ে ফেলে। তবে মাসখানেক যাবত আগের আবেগটি মরে গেছে বলে মনে হয়। এ আবেগ মরে যাওয়ার বিষয়টি পরে জানা যাবে। আর মুরাদতো জানি দোস্ত হিসেবে লিমন যতক্ষণ অনলাইলে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত এ কথা সে’কথা চালাচালি করবেই। এখনও তাই করছে। তাদের চ্যাটিংয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনীতি কোন প্রসঙ্গই বাদ যায়না। তাই দু’তিনজনের সাথে একই সাথে চ্যাটিং করতে গেলে বেচারী জিনিয়া সহজেই জায়গা পায় না। আজও অনেক পরে ভাগে পাচ্ছে জিনিয়া। তাই কিছুটা অভিমানের মতো করেই বলে-
তোমার বোধ হয় অনেকেই এখন অনলাইলে?
অনেকে মানে?
তুমি দেখছি এখন ভাজা মাছটিও ওল্টে খেতে জাননা। কেন, ওই বিদেশিনী। আমি সার্লির কথা বলছি। নিশ্চয়ই ওই সার্লিও…।
হ্যা ও আছে। মুরাদও আছে।
মুরাদ বলছে-দোস্ত ফেইসবুকে সদ্য আপলোড করা তোর প্রোফইলের ছবিটা খুব জোসি হয়েছে।
থ্যাঙ্কস। তুই কই? খবর নেই অনেক দিন।
না আছিতো। তোর সাথে হয়তো বেটে-বলে হয়ে ওঠে না। তুই নেটে থাকলে আমি থাকি না, আমি থাকলে আবার তোকে পাইনা। হাঃ হাঃ হাঃ যেনো ঘর কাপিয়ে হাসে মুরাদ।
ও সে কথা। রেশমির খবর কি?
ওই আছে। আমার সাথেতো চালাচ্ছেই। ইদানিং শুনছি আরো কয়েকজন জুটেছে। সে’দিনতো টিএসসিতে গিয়ে দূর থেকে দেখি এক ছেলেকে বগলদাবা করে হাটছে। সে বলে আমি তার আসল, বাকিগুলো ফাও।
তারপর তারপর! বেশ মজার তো!
তুই বলছিস মজার। এ কথা বলতে পারলি ত্ইু। একেই বলে‘কারো পৌষমাস আর কারো সর্বনাশ।’
এখানে সর্বনাশের কথা আসছে কেন! তুই ও রেশমির মতো আরো কিছু জুটিয়ে নে। আর এমনতো নয় যে, তোরও একাধিক নেই। একবারে আনচাসড, আনকোড়া।
দূর শালা! আমাকে তুই রেশমির মতো ভাবলি। পটিয়ে-পাটিয়ে মেয়েদের সাথে জমাতে পারি এই যা, আমিতো ওর মতো বড় কাজ করি না।
বড় কাজ মানে?
অনেকে বলাবলি করে ও নাকি ইদানিং বয়ফ্রেন্ডদের সাথে হোটেলে-টোটলেও ডেটিংয়ে যায়।
দ্যাত!। না জেনে কাউকে এ ধরণের ব্লেইম দেয়া উচিত নয়।
আরে না। আমি বলছি না। এর অনেক কাছের বন্ধুই বলেছে।
বন্ধুরাতো বলবেই। তোকে পিছকিয়ে দেয়ার জন্যও বলতে পারে বোঝলি বোকা। তবে সব বন্ধুরা এসব কথা বলবে না। যারা রেশমির কাছে চান্স পাচ্ছে না; তারাই এসব কথা বলে বেড়ায়।
না, না ওর অনেক জানিদোস্ত বলে।
থাক ওসব বাজে কথা। আমিতো তোর চেয়ে ওকে কম চিনিনা। রেশমি আমার দুই বছরের ঝুনিয়র হলেও জিনিয়ার কারণেতো সেও আমার বন্ধু। ওর অবস্থা হলো ‘হাটু দেখিয়ে গাঙ পার’এর মতো।
তোকে কখনো দেখিয়েছে?
না, আমাকে দেখানোর কখনো সুযোগ পায়নি। আর আমিও হাটু দেখে গাঙ পার হতে চাইনি যে?
তোর ও যা কপাল। আমি এত চেষ্টা করেও যার সাথে গিট লাগাতে পারলামনা, তুই ব্যাটা সেরাটা বাাগিয়ে বসে আছিস। তোরতো হাটু দেখার কথা নয় বন্ধু। আমাদের এসব নিয়ে চলতে হয়। মানে চালিয়ে যেতে হয়।
ও এ’সব না। তবে রেশমি! যাতে মাতাল তালে ঠিক।
তুই আসলে ঠিকই বলেছিস। ওরই বা দোষ কি ওর যে রূপ-যৌবন কে না ওর একটু সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হতে চায়। এমনকি জুনিয়ার স্যাররা পর্যন্ত ওকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। মুরাদ বলে।
খুবই সত্য কথা। ও এমনিতে একটু ডেসপারেট, ওই সব বিষয়ে খুব সাবধানী। কাজেই অন্যরা যে যা বলে বলুক। তোর মুখ থেকে আমি এসব বাজে কথা কখনোই শুনতে চাই না। অন্য কথা থাকলে বল। লিমন বলে।
আচ্ছা গুরু। আচ্ছা। একটু কাজ আছে; এখন বেরিয়ে গেলাম।
ওকে। বাই।
এখন অন লাইনে সার্লি বা জিনিয়া কেউ নেই।
লিমন আবার ফেসবুক নিয়েই মেতে ওঠে।
কতক্ষণ বিক্ষিপ্তভাবে এর-ওর স্টেটাসে কমেন্টস লিখে হঠাৎ করেই পিসিটা লগআউট করে বেরিয়ে যায়।

সকালে ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই জিনিয়ার ফোন। বিছানায় শুয়ে ফোন ধরেই লিমন বলে-
কি ব্যাপার, এত সকালে? কোন সমস্যা।
সকাল মানে কয়টা বাজে তোমার ঘড়িতে? ছুটির দিনে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠো জানি; কিন্তু বারটায় যে তোমার সকাল হয় সেটা জানা ছিলনা।
প্লিজ রাগ করনা লক্ষ্মীটি, কাল ঘুমাতে ঘুমাতে এমনিই অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল।
কেন, দেরি হবে কেন? তোমার ঘুমের ব্যাঘাত হবে মনে করেতো আমি বারটার দিকেই তোমাকে ছেড়ে দিলাম। তারপর কার সাথে মোজ করেছো? ওই সাদা চামড়ার সার্লির সাথে।
ওর একাই সাদা চামড়া হতে যাবে কেন। তোমার চামড়াওতো কম সাদা নয়। আর একটু হলেই হয়ে যেতে দুধসাদা। তবে এই রঙটাই ভাল।
কোন রঙটা?
এই যে তোমার দুধে-আলতা রঙের কথা বলছি।
ফাজলামো করো না। আমাকে তুমি বোকা পেয়েছো পাম্প দিয়ে যা বলবে তাই বিশ্বাস করবো। তুমি যে ডুবে ডুবে সার্লির ঘাটের পানি খাও, তা আমি বোঝতে পারি না ভেবেছো।
তুমি আমাকে এ কথা বলতে পারলে?
কেন পারবো না, তুমি সার্লিকে জুটিয়েছো না।
আরে শালা, সেতো হলো বিদেশিনী, থাকে সাতসমুদ্র তের নদীর পারে। জাস্ট আগের আমলের পেনফ্রেন্ডের মতো। এতে দোষের কি আছে, আশ্চার্য! কথা ঘুরিয়ে দিতে লিমন বলে-
রেশমির ব্যাপারে মুরাদ কি বলেছে জান?
মুরাদ বলেছে তোমাকে, আমি জানবো কি করে। তা ছাড়া আমাদের ডিপার্টমেন্টে মুরাদ আছে কয়েকজনই। যেমন-‘হেতাগো দেশের মুরাদ’, ‘মোরে চেন’ মুরাদ, টেরা মুরাদ। তো তুমি কার কথা বলছো আমি জানবো কেমন করে। জিনিয়ার কথা শেষ হতে না হতেই লিমন বলে-
আরে ওই মুরাদ। যে নাকি তোমার কাছে চান্স না পেয়ে, বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে তোমার সাথে আমার মিলন ঘটিয়ে দিল। বুঝেছো, গুদু গুদু পিয়ারী।
কথা ঘুরিও না। ক্যাম্পাসের ছেলে-মেয়েদের কানাঘুষা শুনি। লিমন অস্ট্রেলিয়া মাইগ্রেট করছে।
ফেসবুক ফেন্ড হলেই কেউ কাউকে মাইগ্রেট করে নেয়! কোথাকার কই, সাত সমুদ্র তের নদীর পার, কেন এ কথা তোমাকে বলিনি আমি। কি আশ্চার্য!
আশ্চার্য কেন? সাতসমুদ্র তের নদী পারি দেয়া কি আজকের যুগে কোনো দূরের পথ। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যাপার। কখন জানি তুমিও ফুরুৎ মারো কে জানে। তাইতো সময় মতো তোমাকে পাই না। ওই সার্লির সাথে এনগেইজড থাকো। দেখ, তোমার মুরাদ টাইপের পাতলা পোলাপানের মতো তুমিও এমন হয়ে যেওনা যেন।
না না মুরাদকে যে যতই খারাপ ভাবুক সে কিন্তু খারাপ না। ও খুবই সহজ সরল ছেলে। দোষের মধ্যে দোষ একটাই মেয়েপাগলা। যাকে দেখে তাকেই ভালবাসতে চায়। তবে রেশমিকেই সে মনে প্রাণে ভালবাসে। অন্য কোনো ছেলের সাথে রেশমিকে দেখলেই মাথা বিগড়ে যায় তার। আর মেয়ে মানুষের দোষ? অনেক মানুষেরই কমবেশী একটা না একটা দোষ থাকে। আর মুরাদের যদি ওই দোষটা না থাকতো তবেতো সে ফেরেস্তা হয়ে যেত। ফেরেস্তাদেরতো কোনো দোষ থাকেনা। মানুষের কিছু না কিছু দোষ থাকবেই।
ঠিক আছে। মুরাদের পক্ষে এত যে সাফাই গাইছো, সে আমাদের ডিপার্টমেন্টের জুলিয়ার সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে হাসপাতাল ক্লিনিকে দৌড়াদৌড়ি করে নাই।
না, এটা ঠিক নয়। ওর কাছ থেকে রেশমিকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য কিছু কিছু ছেলেপেলে এসব প্রচার করছে। বাজে ব্লেম দিচ্ছে।

তা হলে ও রেশমির বিরুদ্ধে তোমার কাছে নালিশ করে কেন? আর একা রেশমির কথাই ও বলছে কেন, সে ও কম কিসে? আজ কৃষ্ণচুড়ার ডালে, তো কাল কদমের ডালে। পরশু দেখবা তেতুল গাছের ঝোপঝারে বেশ্যা কোকিলের মতো অন্য কোকিলার সাথে গড়াগড়ি খাচ্ছে। স্বগেতোক্তির মতো করে বলে-‘রসুন পেয়াজকে বলে তোর পাছায় লোম ক্যান?’ ভাল বলেছোতো। তুমি মাঝে মাঝে এমন সব ডায়লগ ছাড়া না যা শুনে না হেসে পারা যায়না।
তো এখন হাসো। কে তোমায় মানা করলো। একদম মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে হাস। কথা শেষ করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিজে নিজেই হাসে জিনিয়া।
হাঃহাঃহাঃ। খুব সুন্দর বলেছোতো। লিমনের কথা কেড়ে নেয় জিনিয়াÑ
এত সুন্দর বলতে হবে না। তুমিতো এক বনেরই কোকিল।
তুমি আমাকে এ কথা বলতে পারলে? তাছাড়া আমিতো ফেরেস্তা না দোষেগুণে মানুষ।
ও আচ্ছা, শুনি তোমার দোষটা কি?
আমার দোষ আমি বলবো কি করে। সেটা অন্যরা বলবে। তুমি বলবে। তোমার সাথে সম্পর্কের বয়সতো আর কম হলো না। হতে হতে হয়ে গেল তিন বছর। তুমিই বল আমার কি কি দোষ আছে?
বলবো? সত্যি বলবো।
অবশ্যই বলবে। একশো’বার বলবে।
না। আজ বলবোনা।
আজ বলবেনা কেন। আজ বললে সমস্যা কি?
না, না কোন সমস্যা নেই। তোমার দোষগুলোতো আগে থেকে নোট করিনি তাই, আগে নোট করে নিই। তারপর বলবো। কথাটা শেষ করে জিনিয়া এমন ভুবন ভুলানো হাসি হাসে যা লিমনকে মুহূর্তে ছুঁয়ে যায়। তারপর কথা ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য বলে-
দেখ বাপু ওই সার্লির সাথে লাইন ফাইন করে আমাকে ছেড়ে আবার অস্ট্রেলিয়ায় ইমিগ্রেন্ট হয়ে যেওনা। এত কথা কি ওই মেয়ের সাথে। রাখলাম বলেই ডিসকানেক্ট হয়ে যায় সাই করে।

পরীক্ষা শেষ তাই ক্লাস নেই, এ্যাসাইনমেন্টের ঝামেলা নেই কারো। অখন্ড অবসর জিনিয়ারও। তাই পুরনো অভ্যাস মতো বিকেলের দিকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন হলে ঘুরতে আসে। ঠিক হলে নয়, হলের খোলা চত্তরে। আজ বসেছে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার লাগোয়া নাটমন্ডলের ভেতরে ঢুকার খালি জায়গাটায়। কথার ফাঁকে ওঠে দাঁড়ায় লিমন। দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে-
তুমি বসো, আমি আসছি।
কোথায় যাও?
চোখ টিপে, এই একটু প্রাকৃতিক কাজ…।
লিমন চলে যায়, জিনিয়া লিমনের চলে যাওয়া দেখে। একটু এগিয়েই নাটমন্ডলের পেছনে জিপার খুলে দাঁড়ায় লিমন। এ অবস্থা দেখে জিনিয়ার হাসি পায়। চেয়ে দেখতে কেমন লজ্জা করে। মাথা ঘুরিয়ে ভাবে ছেলেদের কত সুবিধা। কেন যে সে ছেলে হলো না। আবার মত পাল্টায়; ধুর ছেলে হলে কি, লিমনের মতো এমন স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, মেধাবী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ পেত। লিমনকে সে যে দিন প্রথম ক্যাম্পাসে দেখে সেদিন এক দেখায়ই ভাল লেগে যায়। কিন্তু কারো সাথে এনগেজ কিনা সেটা ভেবে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। জিনিয়া লক্ষ্য করে ছেলেটার মেয়েদের সাথে লটরপটর বা ঢলে পড়ার ভাব নেই। এমনি সবার সাথেই ভাল সম্পর্ক। কিন্তু রেশমি সব সময় লিমনের সঙ্গ চায় বলে মনে হলো। তবে রেশমির সাথে যে কোন রিলেশন বিল্ডাপ হয়নি তা নিশ্চিত হয়েই লিমনের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলো। শেষে মুরাদের মাধ্যমে আরো কাছাকাছি, এভাবে কিছুদিন চলার পর লিমনই প্রথম প্রপোজ করে। এর পর থেকে লিমনের কাছে সে হয়ে যায় হাসন রাজার পিয়ারী। এ কথা ভাবতে ভাবতে মুহূর্তেই নিলুয়া বাতাসে জিনিয়ার মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
ফিরে আসে লিমন। আসতে আসতেই জিনিয়া বলে-
কাল রেশমির সাথে দেখা হলো। অনেক কথা হলো। জিজ্ঞেস করলো তোমার আমার সম্পর্কের কতটুকু।
আচ্ছা, আচ্ছা। একটা কথা বলবো?
বল যতটা খুশি? এখন আমার মন ফুর ফুরে।
ও তাই বোঝি, তো এত ফুরে ফুরে মনের কারণ কি?
না তোমাকে বলা যাবেনা। তুমি কি বলতে চেয়েছিল সেটাই বল।
না, তেমন কিছু না। শুধু বলতে চাই, পরের কথা নিয়ে আমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে লাভ নেই। চল চল অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। একটু পরেই এখানে ফেন্সি মামারা জড়ো হতে শুরু করবে।
তাই ভালো । পাবলিক লাইব্রেরির গেটের সামনে চলো। লিমন হাত বাড়িয়ে জিনিয়াকে টেনে বসা থেকে ওঠায়। উঠতে উঠতে জিনিয়া বলেÑ
ওখানে আবার কেন?
তোমাকে চিকেনগ্রিল আর ফুসকা খাওয়াবো। বুঝলে পিয়ারী।
হেসে সায় দেয় জিনিয়া।

জিনিয়া সার্লির ব্যাপারে ভীষণ জেলাস। সে চায়না সার্লির সাথে কথা চালাচালি ও অন লাইন সম্পর্কটা কন্টিনিউ করুক। তবে জিনিয়ার সন্দেহটা মোটেই অমূলক নয়। সার্লি যে পাগালপারা আগে বেশ ক’বারই বলেছে লিমনকে। মাস খানেক আগেতো সরাসরি বলেই ফেলেছে কাগজপত্র সব পাঠাতে। সে নাকি মাইগ্রেশনের সব ব্যবস্থা করবে। কিন্তু লিমন তার পিয়ারীকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছে না। তার মতো কেউ লিমনকে এমন পাগলের মতো ভালবাসতে পারবেনা। তাই সার্লিকে ও পাশ কাটিয়ে গেছে। বলেছে-
আমি মা-বাবার একমাত্র ছেলে। আমার পক্ষে অস্ট্রেলিয়ায় মাইগ্রেট করা সম্ভব নয়। আর আমিতো জিনিয়ার কথা তোমাকে বলেছিই। আমি বিট্রেয়ার হতে পারবো না। লিমনের কথায় সার্লি সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিল। এক সপ্তাহ আর কথা বলেনি। সাপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে আবার কথা বলা শুরু করেছে। চ্যাটিং করছে। ফেসবুকে নিত্যনতুন স্টেটাস পোস্ট করছে।
তবে লিমনের প্রতি জিনিয়ার আজকের অভিমানটা বেশ শীতল বলেই মনে হলো। আগে কখনো এমন মনে হয়নি। তাই লিমনের মনটাও হঠাৎ করেই কালো মেঘের বিষন্নতায় ঢেকে যায়।
সব ডাউনলোড ক্যানসেল করে বেরিয়ে যায় নেট থেকে। জিনিয়াকে কল করার জন্য মোবাইল সেট হাতে নিয়েও আবার কি ভেবে রেখে দেয়।
জিনিয়া কিছুদিন ধরেই বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। লিমন ও জিনিয়ার পারিবারের সবাই তাদের সম্পর্কের কথা জানে। পারিবারিক অবস্থান দু’পক্ষেরই প্রায় সমান সমান। লিমনের বাবা সৎ ও আদর্শবান সরকারী আমলা জিনিয়ার বাবা বড় ব্যবসায়ী। কিন্তু জিনিয়ার বাবা কিছুতেই বেকার ছেলের কাছে মেয়েকে দিয়ে দিতে রাজি নন। তার কথা ‘আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব যখন জিজ্ঞেস করবে ছেলে কি করে? তখন বেকার ছেলে বললে কি ইজ্জত থাকবে? ’তাই তিনি গোঁ ধরেছেন কিছুতেই বেকার ছেলের কাছে মেয়েকে বিয়ে দেবেন না।
কিন্তু লিমনকেতো পুরোপুরি বেকার বলা যাবেনা। লেখাপড়ার পাশাপাশি ও একটা প্রাইভেট পার্মে পার্টটাইম জবও করছে। সেখান থেকে যে বেতন পায় নিজের ও পারিবারের টুকটাক এটাসেটা ভালভাবে করাও যাচ্ছে। তাই এ পার্টটাইম চাকুরীর কথা পারতপক্ষে কাউকে বলেও না। আর এটাতো তার পার্মানেন্ট চাকুরী নয়। লিমন অপেক্ষা করছে, রেজাল্টটার জন্য। রেজাল্ট বেরিয়ে গেলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এমবিএর চাকুরীর সমস্যা হবেনা। আর তার একাডেমিক যে রেজাল্ট যেখানেই হোক একটা ভাল বেতনের চাকুরী জুটিয়ে নিতে পাবে সে। তাছাড়া আগামী মাসে বিসিএসের রেজাল্ট বেরিয়ে যাওয়ার কথা। না হলেতো পরের মাসেতো বেরুবেই। ভাইভা যা হয়েছে তাতেতো লিমন বেশ আশাবাদী। প্রশাসন ক্যাডারে চাকুরী হয়ে গেলেতো কথাই নেই। মাঝে এ কিছুদিন আপেক্ষার কথা জিনিয়াকে বলেছে লিমন।
সে’দিন টিএসটি সড়ক দ্বীপে ফুচকা খেতে খেতে লিমন হাসতে হাসতে জিনিয়াকে বলে-
আর মাত্র ক’টাদিন অপেক্ষা করো পিয়ারী। এরই মধ্যেই হয়তো রেপুটেড কোনো ব্যাংকে বা একজন ব্যাংকার, না হয় মেজিস্ট্রেট হিসেবে কোথায় একটা কিছু হবে যাবে। বেকারত্বের খাতা থেকে নাম কাটাতে পারলে নিশ্চয় তোমার বাবা আর অমত করবেন না। আর অমত করলেই তখন মানবে কে? নিজেদের বিয়ে তখন নিজেরাই করে নেব। কি পারবে না? এতটুকু সাহসী হতে পারবেনা?
জিনিয়াও সেদিন মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিল লিমনের কথায়।
কিন্তু জিনিয়ার বাবা যে তোড়জোর শুরু করেছে, তা আটকিয়ে রাখা যাবে কতক্ষণ এ নিয়ে জিনিয়া প্রায় মন মরা হয়ে থাকে। মন মরা হয়ে থাকার কারণ সার্লিও। জিনিয়া ভাবে লিমনকে যদি সত্যি সত্যি অভিবাসনের ট্রেপে ফেলে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যায়। তখন কি হবে। জীবনের সব স্বপ্নসাধ যে ধূলোয় মিশে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজকে আবার প্রবোদ দেয়; লিমন কখনো এমন করতে পারেনা।

কয়েক দিন পর সাইবার গার্লের আবারও রিকোয়েষ্ট পাঠায়। এবার প্রোফাইল পিকচারে এটা লেংটুবাবুর ছবি। কৌতুহলবশে লিমন ইনফোতে ক্লিক করে। ইনফো আপডেট করা হয়েছে। তবে সাফিসিয়েন্ট নয়। আগের ইনফোতে মাত্র দুইটি তথ্য ছিল এবার একটি বেড়েছে। সাইবার গার্ল। ফিমেল। ঢাকা ইউনিভার্সিটি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি দেখে লিমনের কৌতুহল বাড়ে। হয়তো তার কোন বন্ধু-বান্ধবই তার সাথে মজা করার জন্য এসব করছে। তাই সে একসেপ্ট করে। তবে ঢাকা ইনিভার্সিটি দেখলেই সেই আইডিধারী যে ঢাকা ইউনিভার্সিটির বর্তমান বা প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী তা বিশ্বাস না করার মতোও ঘটনা ঘটে অনেক সময়। অনেকে এমন ফেইক আইডি করে থাকে। বাস্তবে পড়ে ইন্টারমেডিয়েটে ইনফোতে লিখলো ঢাকা ইউনিভার্সিটি।
হাল আমলের ছেলে-মেয়েরারা যে কত রকমের রহস্য করে! মোবাইল ফোন বিশেষ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোতে এ ধরণের রহস্যময় খেলা আরো বেশী চলে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে এসব রহস্যময়তা ঘটনাতো ঘটছে অহরহ। শুধু রহস্য করা নয় বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্কে নিজেদের আসল নাম গোপন করে, নকল আইডি খুলে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে রহস্য ও মজা করার পাশাপাশি প্রতারণাও করছে। ঘটছে শত শত ব্ল্যাকমেইলিং এর ঘটনাও। তাই কারো সন্মন্ধে ভালভাবে না জেনে, ফ্রেন্ড করা ঠিক নয় এটা সবাইকে বলে লিমন। আর সেতো এ ব্যাপারে সদাসতর্ক।
ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট একসেপ্ট করার পর থেকে সাইবার গার্ল মাঝে মাঝে পোক করে। বা কখনো কখনো এমন সব মেসেজ পাঠায় তা থেকে বোঝা যায় ঢাকা ইনিভার্সিটিরই কোন জুনিয়ার মেয়ে। সরাসরি বলতে পারছেনা বলেই এই রহস্যের পথ যে বেছে নিয়েছে অকপটে বলেছে সে কথা।
প্রথম মেসেজটিতেই একেবারে সরাসরি প্রস্তাব করেই লিখেছে-
আমি আপনার দুই বছরের জুনিয়ার। আপনাকে প্রথম দেখি মধুর কেন্টিনে। আমরা আরো কয়েক বন্ধু সেখানে বসে চা খাচ্ছিলাম। আপনাকে দেখে আমি কিছুতেই চোখ নামাতে পাছিলাম না। হঠাৎ করেই শরীরে পাউন্ডিং শুরু হয়। মুহূর্তে ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যেতে শুরু করে। অপলক দৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী যার নাম এখন আমি আপনাকে বলবো না। সে আমাকে বললো-
কিরে, তুই কি লিমন ভাইকে চিনিস? ও বিজনেস স্টাডিস ডিপার্টমেন্টের খুবই জিনিয়াস স্টুডেন্ট। রেজাল্ট হলেই বেরিয়ে যাবে এবার। সম্প্রতি এমবিএ ফাইনালও শেষ করেছে। শুধু জিনিয়াসই বলছি কেন, ভয়ঙ্কর হ্যান্ডসাম। ওর জন্য ক্যাম্পাসের কত মেয়ের রাতের ঘুম যে হারাম হয়ে যাচ্ছে। আমিসহ আরো কয়েকজন চেষ্টা করেছি কাজ হয়নি। কোন মেয়ে প্রপোজ টপোজ করলেই নাকি দার্শনিক-টার্শনিক ভাব ধরে বলে-
তোমাদের সামনে উজ্জল ভবিষ্যৎ, প্রেমটেমে জড়িয়ে গেলে লেখাপড়ার ক্ষতি হবে। এসব করার ঢের সময় পাবে? বুঝেছো। আপতত: লেখাপড়াটা ঠিক মতো চালিয়ে যাও। যেন বড় ভাই।…
সত্যি সত্যি সেদিন বাসায় গিয়ে আমার চোখের ঘুমও হারাম হয়ে গেল। এপাশ ওপাশ করে সারারাত ঘুম হলোনা। ঘুমহীন বিনিদ্র রাত কাটিয়ে সেদিনই ক্যাম্পাসে এসে অনেক খোঁজাখুঁজি করে আর আপনাকে পাইনি। সে’দিন আমার মনে হাহাকার শেয়ার করার মতো কাউকে খুঁজে পেলাম না। আপনাকে ভালোবাসি ভীষণ ভালোবাসি। যখন দেখলাম এভাবে হবে না। তখন একদিন ফেসবুকে আপনাকে নাম সার্চ দিতেই পেয়ে যাই। দেখলাম আপনার অনেক ফ্রেন্ড। সে’দিনই রিকোয়েষ্ট পাঠাই। কিন্তু কোনো রেসপন্ড নেই। আমার মনের ধুকধূকি বাড়ে; আর মনে মনে ভীষণ বকি আপনাকে। ভাবলাম হয়তো ইগনোর করবেন। না ইগনোরও করছেন না। আগে ইচ্ছে করেই ইনফর্মেশনে বেশী তথ্য দিইনি। পরে ভাবলাম ইট ওয়াজ নট সাফিসিয়েন্ট। তাই আপডেট করলাম। আসলে এটা ছিল আমার নতুন আইডি। অনেক আগে থেকেই আমি ফেসবুকে আছি। সে আইডিটার কথা এখন বলবো না। যে দিন আমার সাথে আপনার দেখা হবে সেদিন বলবো। আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই। আপনার মতামত পেলে জায়গা ঠিক করবো, কোথায় দেখা হবে। প্লিজ আমাকে নিরাশ করবেন না।
ম্যাসেজটি পাওয়ার পর লিমন অনেক ভেবেছে। মেয়েটি যে তার প্রতি মজে গেছে তা নিশ্চিত। তাই দেরি না করে এখনই তাকে নিবৃত্ত করা উচিৎ। তার পরও ভাবতে ভাবতেই বেশ কিছুদিন সময় চলে যায়। অবস্থা এমন হয়েছে, ঠিক এ মেয়েটির ভয়েই নেটের পোকা লিমন নেটে বসতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। এ মেয়ে চ্যাটিং লিমনকে অন লাইনে পেলেই চ্যাটিংকরা শুরু করে। তাই বাসায় হোক আর অফিসেই হোক সাইবার গার্ল অন লাইনে আছে দেখলেই লিমন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লগ আউট হয়ে যায়।
তবু লিমন সেদিনের ম্যাসেজের সংক্ষিপ্ত উত্তরে বলেছিল-দেখ তোমার সাথে কখনো আমার দেখা করা সম্ভব না। তাছাড়া আমি এনগেইজড। খুব সহসাই আমাদের বিয়ে হবে। আশা করি এ বিষয়ে তুমি বিরক্ত করবেনা।
এরপর থেকে মেয়েটিকে এড়িয়ে চলার জন্য ওকে ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে বাদ দেয় লিমন। তবু কিভাবে কোত্থেকে লিমনের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে সময়ে অসময়ে ফোন করে তার জীবনটাকে বিষিয়ে তুলছে। মেয়েটি। বিষয়টি শেয়ার করে জিনিয়ার সাথেও। জিনিয়া বরং উল্টো বোঝে লিমনকে। ফোনে সাক্ষাতে এ নিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলে জিনিয়া। এ নিয়ে অনাকাঙ্খিত ও বিব্রতকর এক পরিস্থিতিতে পড়ে লিমন। তার সন্দেহ হয় মেয়েটি তাকে ব্লাকমেইল করতে চাচ্ছে নাতো?
আজ দুপুরে লিমন যখন অফিসে কাজ নিয়ে ব্যস্ত ফোন করে বলেছে-কোনদিন সাক্ষাত হচ্ছে, দিন তারিখ ঠিক করে জানাতে। না হলে টিএসসিতে শত শত মানুষের সামনে সে আত্মহত্যা করেবে।
বিষয়টা পুলিশকে জানাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েও পরে চিন্তাটি বাদ দেয় লিমন। কারণ এতে হিতে বিপরীত ফল হতে পারে। ব্যাপাটি নিয়ে আরো বিশদ আলোচনার জন্য জিনিয়াকে ফোন করে শিল্পকলার কফি হাউজের কাছে থাকার জন্য। মতিঝিলের অফিস থেকে বের হয়ে বাসে চাপে লিমন। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেসক্লাবে এসে নেমে রাস্তা পার হয়ে শিল্পকলার দিকে হাটতে থাকে। মন তার বিক্ষিপ্ত। হঠাৎ করেই দ্রুত গতির একটি মাইক্রোবাসের চাপায় পড়তে যেয়ে মুহূর্তেই সড়ে দাঁড়ায়।
দিন ও রাতের অন্তবর্ত্তী সময়ে কফি হাউজের কাছে পৌঁছতে জিনিয়াকে নজরে পড়ে লিমনের। জিনিয়া কার সাথে যেন মোবাইলে গল্প করে উচ্চস্বরে হাসছে। লিমনকে দেখেই কথা বলা বন্ধ করে দেয় জিনিয়া।
কফি হাউজের সামনে কোন এক কবির জন্মদিনের উৎসব হচ্ছে। বেশ সাজ সাজ অবস্থা এলাহীকান্ড। কবিদের এটা এক ধরনের প্রচার চালানোর কৌশল। এ জায়গাটা এড়িয়ে লিমন শিল্পকলার ডিজির অফিসের সামনে এসে খোলা জায়গায় বসতে বসতে জিনিয়া বলে-
কি ব্যাপার এত জরুরী তলব?
লিমন অনেকটাই শুস্ক ও নিস্প্রভ স্বরে বলে-
তোমার সাথে একটা পরামর্শের জন্য তোমাকে ডেকেছি। ওই ফাজিল মেয়েটিকে ফ্রেন্ডলিস্প থেকে বাদ দেয়ার পরও কোত্থেকে যেন আমার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে কাল থেকে ফোন করে বিরক্ত করছে।
কথাটা বলতে যেয়ে লিমনের চেহারাটা কেমন বাংলা পাঁচের মতো দেখাচ্ছে। এ অবস্থা দেখে জিনিয়া কুটি কুটি হাসছে। কিছুতেই যেন সে তার হাসি থামাতে পারছে না।
জিনিয়ার হাসি দেখে স্বভাববিরুদ্ধ রেগে যায় লিমন। হাসি থামিয়ে জিনিয়া বলে-
আরে আজবতো! তুমি আমার ওপর রাগছো কেন?
রাগ করবো না। আমি একটা সমস্যার মধ্যে আছি, আর তুমি মজা করছো।
নিজে নিজে সমস্যা সৃষ্টি করলে সমস্যার মধ্যে থাকবেনাতো কি শান্তিতে থাকবে? যেভাবে সমস্যা সৃষ্টি করেছো, সেভাবেই সমস্যা সামলাও।
আমি সমস্যা সৃষ্টি করেছি মানে? আমি কি ওই ফাজিল মেয়েকে চিনি!
না চিনলে, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট কনফার্ম করতে গেলে কেন?
আরে বাবা আমারতো তিন হাজারের ওপরে ফ্রেন্ড; ভেবেছি মেয়েটি হয়তো এদের মতোই কেউ।
আবারো হাসে জিনিয়া। হাসি দেখে রেগেমেগে ওঠে দাঁড়ায় লিমন। জিনিয়া হাত ধরে টেনে বসায়। লিমন কোন কথা বলে না। অন্যদিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। জিনিয়া বলে-
খুলে বল সমস্যা কোন পর্যায়ে গেছে? রাগ করনা বল। এই হাসি বন্ধ। এই সিরিয়াস। বল।
বরফ গলে লিমনের। গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় নেয়। জিনিয়া তাড়া দেয়। বলনা কি হয়েছে?
মেয়েটি এক এক সময় এক একটি নম্বর থেকে ফোন করে। আজ দুপুরে অন্য একটা নাম্বার থেকে ফোন করে বলেছে তাকে সাক্ষাতের সিডিউল জানাতে। তা না হলে নাকি এরই মধ্যে সে টিএসসিতে এসে সবার সামনে আত্মহত্যা করবে। মেয়েটিকে এত করে বললাম, যে আমি এনগেইজড। সহসাই আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমার এ কথার উত্তরে ফাজিল মেয়েটি বলে কি জান?
কি বলে। হেসে হেসে জিনিয়া জানতে চায়।
তুমি আবার হাসছো।
হাসছি তোমার অবস্থা দেখে। ঠিক আছে হাসবো না বল-
সে ধমকের সুরে বলে-ওসব এনগেইজড বিয়ে টিয়ে বুঝিনা। আগে সাক্ষাত তারপর অন্য কথা। আরেকটি কথা আমাদের যেখানে সাক্ষাত হবে তৃতীয় কোন ব্যক্তি সেখানে এলাউড নয়। আপনি একা আসবেন, বুঝলেনতো। বলেই ফোন রেখে দেয়।
এক কাজ করো। মেয়েটি যখন এত করে বলছে, তুমি ওর সাথে দেখা করো। পরে যদি সমস্যা করে তুমি আইনের সাহায্য চাইবে। আমি তোমার পাশে থাকবো। তোমাকে আগে বলেছি কিনা জানিনা, ডিএমপিতে আমার এক এডিসি নিকট আত্মীয় আছেন। কোনো উল্টাপাল্টা করলে উনাকে দিয়ে মেয়েকে সাত ঘাটের পানি খাওয়াবো। মঘেরমুল্লুক পেয়েছে! ফাজিল মেয়ে পরে বোঝবে ‘হট ইজ দ্যা পাইস অব রাইস।’ঠিক আছে যা বলছি তা ই করো। সময় নষ্ট করো না।
তুমি বলছো ? ঠিক আছে।
শেষ বিকেলের এই আনন্দ-কলোরিত বিকেলে কোত্থেকে যেন হঠাৎ করেই হতাশার কালোমেঘ এসে জড়ো হয় লিমনের মনের গহনে। এই বুঝি বর্জ্রঝড়ে সব কিছু লন্ডভন্ড করে দেবে। লিমন চেয়ে আছে অন্য দিকে আর জিনিয়া নিমগ্ন লিমনের মধ্যে। সে আরো ঘন হয়ে ডান হাতে কোমড় পেচিয়ে ধরে। লিমন তাকায় জিনিয়ার দিকে। জিনিয়া শান্তনা দেয়-
এত ভেবনাতো। কোথায় তোমাদের সাক্ষাত হচ্ছে তা আমাকে আগে থেকে জানিয়ে রেখ। কঠিন সমস্যা হলে যেন দ্রুত তোমাকে রেসকিউ করা যায়। আমারতো মনে হয় তোমাকে ঝামেলায় ফেলে ফাজিল মেয়েটি টাকা টাকা আদায় করতে চাইবে।
জিনিয়ার কথা শুনে যেন লিমনের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। সে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে জিনিয়ার দিকে। এতক্ষণে রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে ওঠেছে। কফি হাউজের সামনে কবির জন্মদিনকে ঘিরে চলছে ধুমধারাক্কা গান, হইহোল্লোর। এসবের কোন কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই লিমনের, এ মুহূর্তে নিজের ভেতরেই নিজে ডুব দেয় লিমন। আলো আঁধারীতে লিমনের চেহারাটাকে খুব ইনোসেন্ট লাগছে জিনিয়ার কাছে।

জাস্ট সন্ধ্যা সাতটায় রমনা গ্রার্ডেন চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে যেতে বলেছে। সে মোতাবেক জিনিয়াকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। সংশয়, সন্দেহ এবং ভয়ে ভয়ে লিমন রওয়ানা দেয় রমনা গার্ডেনের উদ্দেশ্যে। গায়ে একেবারে সাদামাটা পোশাক। গোঁফ-দাড়ি কামানো নয়। চুলও আচরানো হয়নি ঠিক মতো। শান্তিনগর থেকে রিক্সা করে যাচ্ছে সেগুনবাগিচায় রমনা গার্ডেন রেষ্টুরেন্টে। অফিস-আদালত ছুটি, হাট-বাজার শপিংয়ে ব্যস্ত মানুষ ও যানবাহনের চাপে এক জায়গায় যেন স্থিও হয়ে আছে, সব ধরনের যানবাহনের চাকা। শান্তিনগর থেকে বিজয় নগর আসতে আসতেই বেজে গেছে সাতটা। এরই মধ্যে দুইবার কল করেছে মেয়েটি। কোথায় আছে জানার জন্য ফোন করেছে জিনিয়াও। জ্যামজোম ঠেলে ঠুলে রমনা গার্ডেনে এসে যখন লিমন রেষ্টুরেন্টে পা রাখে তখন সাতটা চল্লিশ। রঙিনবাতির স্বল্পআলোর এই কোজিনটির ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকায়। ভেতরের দিকে বেতের পার্টিশন ঘেরা কয়েকটি কেবিন। এর একটি থেকেই বোরখা পড়া একজন মহিলা এগিয়ে এসে লিমনকে অভ্যর্থনা জানায়।
আসুন প্লিজ ভেতরে গিয়ে বসি।
লিমন বাধ্যছেলের মতো মহিলাকে অনুসরণ করে।
কেবিনগুলোর একটিতে এসে বসে ওরা দু’জন, এর পাশেরটিতেই একা একটি মেয়ে হয়তো তার কোন মেহমানের জন্য অপেক্ষা করছে। লিমন মহিলার সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে আঁড়চোখে একবার তাকায় পাশের কেবনিটিতে। কিন্তু তাদের দিকে পিছন ফিরে বসার কারণে এর পিঠের কিছুটা অংশ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। মেয়েটিই প্রথম কথা বলে-
আমার অনুরোধ রক্ষা করার জন্য অনেক আনেক ধন্যবাদ। ম্যানুচার্টটি লিমনের দিকে এগিয়ে ধরে বলে-
আপনি অর্ডার করুন। তবে শর্ত, বিল আমার।
নো থেঙ্কস। আমি ওসব কিছু খাবনা। আমার তাড়া আছে। মনে মনে বলে‘মেয়ে দেখছি সেই লানসন লেডির মতো নয়। ছেলেদের পকেট কাটার মেয়ে নয় সে, এটা নিশ্চিত হয়ে, নিজের ভেতরে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে।
কি এখনো রেগে আছেন তাইনা? ঠিক আছে আমি অর্ডার করছি।
লিমন এর কোনো জবাব দেয় না। মেয়েটিকে বোঝার চেষ্টা করে। কন্ঠস্বরটি বেশ চেনা চেনা। কিন্তু রঙিন বাতির আলো-আঁধারীতে চেহারা স্পষ্ট দেখা যায়না। চেহারা না দেখা যাওয়ার কারণ হচ্ছে সে নেকাবে নাক মুখ ঢেকে বোরকা পড়েছে। শুধু চোখ দুটো দেখা যায়। চোখ দেখে বোঝা মেয়েটি খুবই সুন্দরী। মেয়েটির কথায় লিমনের ভাবনার সুতো ছিড়ে যায়-
আপনি বোধ হয় আমাকে খুব খারাপ ভাবছেন। আমারই বা দোষ কি ‘প্রেম না মানে কোনো মানা।’
খুবই ক্ষীণস্বরে কথা বলছে মেয়েটি। পাশের কেউ শুনে ফেলবে এই কারণে হয়তো।
তবে রেষ্টুরেন্টটিতে আজ তেমন চাপ নেই। ছুটির দিনে এখানে কিউ করে ঢুকতে হয়। নিরিবিলি। প্রেমিক-প্রেমিকাদের ডেটিংয়ের একটি অনন্য জায়গা এটি। এক্সপেনসিভ বলে সাধারণ গ্রাহকরা এখানে আসেনা।
মেয়েটিই আবার বলে-কিছু বলছেন না যে?
ওই কথার পিঠে কথা বলে লিমন-
আমিতো আগেই বলেছি আমার জরুরী কাজ আছে, কেন ডেকেছেন তাড়াতাড়ি বলুন।
নতুন করে কি আর বলবো। আমি শুধু আপনাকে চাই। আর কিছ্ইু চাইনা। শুধু আপনাকে।
এটা কোনদিনই সম্ভব নয়। আমিতো বলেছি, আমি এনগেইজড।
ছো হোয়ট। এনগেইজড হয়েছেন তো কি হয়েছে; আপনাদের বিয়েতো আর হয়ে যায়নি।
না হলেও অচিরেই হবে। লিমনের কাঠখোট্টা জবাব।
ওইতো একই কথা, এখনও হয়নি। বিয়ের আসর থেকে কত বিয়ে ভেঙে যায়, আর আপনাদের এনগইজমেন্ট তো হচ্ছে কথা দেয়া। সুতরাং আমার চান্স এখনো ফিফটি ফিফটি।
একশ’তো নয়। লিমন নির্লিপ্তভাবে বলে।
চটপট উত্তর দেয় মেয়েটিও- ফিফটি এমনই একটি নাম্বার যা যে কোন সময় একশ’ হয়ে যেতে পারে। বলেই মেয়েটি চাপাহাসি হাসে।
আরে বাবা আপনি নিজে নিজে ফিফটি কেন একশ’ পার্সেন্টওতো ভাবতে পারেন। তা আমার কাছে মূল্যহীন। জিরো। আর এভাবে জোর করেতো কাউকে ভালবাসা যায়না। আমারতো প্রশ্ন এভাবে আমার ওপর আছর করেছেন কেন। নিশ্চয় কোনো মতলব আছে।
না, না কোনো মতলব নেই। একেবারে নির্ভেজাল ভালবাসা। ভেনাস, হেলেন, বাংলা সিনেমার ইসুব-জুলেখা, লাইলি-মজনুর মতো।
আপনি কি, এসব ফালামো করার জন্য এখানে ডেকে এনেছেন? আমি ওঠলাম।
বুঝেছি এভাবে হবে না। আঙ্গুল বাঁকা করতে হবে।
আঙ্গুল বাঁকা করতে হবে মানে?
প্রচলিত ও সহজ ভাষায় যাকে বলে কিডন্যাপ।
করেই দেখেনা সাহস থাকলে?
চ্যালেঞ্জ করছেন?
চ্যালেঞ্জ।
মেয়েটি ঝট করে উঠে দাড়িয়ে নেকাব খুলে বলে-
এই কে কই তোরা। এদিকে আয়। আয়তো জিনিয়া, শালারে কিডন্যাপ করি।
পাশের কেবিন থেকে সেই মেয়েটির খিলখিল আওয়াজ ভেসে আসে। লিমন কেমন হতচকিয়ে যায়। বিষয়টি বোঝে ওঠার আগেই জিনিয়া বেরিয়ে এসে সামিল হয় দু’ জনের সাথে। হাত জোর করে জিনিয়া বলে-
স্যরি। ভেরি ভেরি স্যরি। এটা আমার প্লেন নয়। রেশমির। কথা কেড়ে নিয়ে রেশমি বলে-
আসলে লিমন ভাই এতে জিনিয়ার কোন দোষ নেই। আমি ওকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম আমি আপনাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে পারবো। সেও আমার চ্যালেঞ্জ করে বলেছে-যদি সে হেরে যায়, মুরাদ তার, তাকেই সে বিয়ে করবে, আর আমি জিতে গেলে আপনি আমার, আমি আপনাকে বিয়ে করবো। হেরে গেলে মুরাদকেই বিয়ে হবে আমাকে।
কিছুতেই যেন লিমন তার ঘোর কাটাতে পারছেনা। এসব কোন কথারই কোন জবাব দিতে পারেনা সে। ঘটনার ঘোরে পড়ে খেই হারিয়ে হতভম্বের মতো চেয়ে থাকে। তারপর জিনিয়া ও রেশমি দুজনের দিকে তাকিয়ে বোকা বোকা চেহারা বানিয়ে বলে-
আমাকে নিয়ে এমন পাগলামোর হেতু কি? এতো দেখছি কূয়োর ব্যাঙদের ঢিল ছুড়ে ছেলেপেলেদের খেলার মতো। চ্যালেঞ্জ করলে তোমরা। আর এর মধ্যে পরে আমাকে বলতে হচ্ছে ‘হে ছেলে-পেলের দল! তোমরা যাকে খেলা ভাবছো, এটা তোমাদের কাছে খেলা হলেও আমাদের ব্যাঙদের জীবন মরণ সমস্যা’ বলেই লিমন হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ উচ্চস্বরে রেষ্টুরেন্টের হল কাপিয়ে হেসে ওঠে। হাসি থামাতে জিনিয়া লিমনের মুখ আলতো চেপে ধরে। তারপর বলে-
রেশমি কি, তুই আমায় চ্যালেঞ্জ করেছিলি না; যে ভাবেই হোক লিমনকে তুই তোর প্রেমের ফাঁদে ফেলে আমাকে বুঝিয়ে দিবি লিমন সবার মতো নকলপ্রেমিক। পারলি চ্যালেঞ্জ বিট করতে? পারবি না। আমি যাকে ভালবেসেছি তাকে অনেক বাজিয়ে-বুজিয়ে ভালবেবেসেছি। সে অন্য আর দশজন ছেলের মতো নয়, একাধিক মেয়ের সাথে প্রেম করবে। জানিস এই ঢাবির ক্যাম্পাসে সাচ্চা মাল এই এক পিছই আছে, সেটা হলো জিনিয়ার এই ওয়ানপিছ লিমন। কিগো! ঠিক বলিনি গুদুগুদু। লিমনের গাল টিপে ধরে জিনিয়া।
হাসতে হাসতে লিমন রেশমিকে বলে-
চ্যালেঞ্জে যেহেতু হেরে গেছ, এখন মুরাদ বেচারাকে ডেকে আনি। কি বল জিনিয়া।
শর্ত অনুযায়ীতো তা ই করতে হবে, কি রেশমি তুই বল।
হাসি ও কান্নার সংমিশ্রনের একটা নেঁকো সুরে রেশমি বলে-
কি আর করা। তোমরা যা ভাল মনে করো। আমি আর কি বলবো।

——————

(মোট পড়েছেন 326 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন