NINE টিন UP

- সুজন

সেবার ট্রেন আসার দু’মিনিট পরে ষ্টেশনে এসে দেখি নাইনটিন আপ মেইল ট্রেন হেলে দুলে নাচতে নাচতে আমার চোখের সামন দিয়ে চলে গেল। অগত্য রাত তিনটের ট্রেনের অপেক্ষা না করে পুরো ছয় মাইল হাঁটতে হয়েছে আমাকে। ঘুঘু্ একবারই ফাঁদে পড়ে। আমারও দ্বিতীয়বারের মত ফাঁদে পড়ার ইচ্ছে নেই। তাই এবার নাইনটিন আপ ওরফে পাঁচটার ট্রেন ধরার জন্য চারটার আগেই ষ্টেশনে উপস্থিত হলাম। খাঁ খাঁ প্লাটফর্ম। সামনের বেঞ্চিতে উদোম গায়ে দশ বার বছরের এক কিশোর শুয়ে আছে। ধীরে ধীরে ওর কাছে গিয়ে বিনয়ের সাথে বললাম,”খোকা পা’টা একটু সরানো যাবে?” আমার কথায় উঠে বসল খোকা। কর্কশ ভাষায় বলল,”ভাইজান আপনে কি পাবনা থন আইছেন? আমি আবার পাগল ছাগলরে খুব ডরাই। তয় ছাগলের গোস্ত খাইতে খুব একটা খারাপ লাগেনা। আপনে কি হাঁচাই পাগল?”
বসতে বসতে মুচকি হেসে বললাম, “আমাকে কি তোমার পাগল মনে হয়?”
” তা হয়না। কিছুটা ছাগল ছাগল মানে কিনা রামছাগলের মতো মনে হয়।”

লক্ষ্য করলাম কিশোরের মুখ অতি উৎসাহে চকচক করছে। ” জানেন ভাইজান” বলেই চলল সে,”আমার মনে হয় আপনে রাম ছাগল না হইয়া রাম পাগল হইতে পারেন। আমার গর্ভধারিণী মা জননী বলেন, দুইনায় আল্লার পাগলের চাইয়া বড় পাগল আর নাই। বড় ছাগলের নাম রামছাগল আর বড় পাগলের নাম রামপাগল। আপনে বড় পাগল হইলে রাম পাগলই হইবেন।”

খোকা এ পর্যন্ত বলে আবার গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ল। ষ্টেশনে দু’একজন করে যাত্রী আসতে লাগল। প্লাটফর্ম সরগরম হতে খুব একটা সময় লাগল না। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে এক লোক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল,” ভাইজান, ট্রেনের খবর হইছে কি?” অবাক কান্ড লোকটা আর কেউ নয়, এযে আমাদের পাড়ার কেন্দু চাচা যিনি কথা একটু বেশি বলেন। বল্লাম,” আরে চাচা আপনি!” চাচা বিস্মিত হয়ে বলল,” কেডা সুজন ভাতিজা? দেখ দেখি কান্ড! ভাইজান বলি ফেললাম। কান্ডর দোষ কি কও? দোষ আমার চোক্ষের। এমনিতে দিনে চক্ষে কম দেখি, রাইতে তো দেখিইনা। সেবার হল কি তোমার চাচীর এক বোন একটা শাড়ী আইনা কইল, দুলাভাই দেখেনতো রংটা কেমুন? আমি তারে খুশি করার লাইগা বললাম, লাল রং তোমারে সোন্দর মানাইবো। আমার কথা শুনে সে তো অবাক। খ্যাঁক খ্যাঁক করে বলল, চক্ষের মাথা খাইছেন নাকি? সবুজ রং লাল দেখেন! আমার কি দোষ কও? ঘোড়ারে দেখি গরু আর ছাগলরে মনে হয় ভেড়া। ভাতিজা তোমারে ভাই বলি ফেললাম। তুমি কিছু মনে কর নাই তো?”
” না, না চাচা মিয়া মনে করার কি আছে? তা আপনি এখানে কি মনে করে?” জানতে চাই আমি।
” সে কথা আর কইয়ো না ভাতিজা। তোমার চাচীর মামাতো ভাই কাল দুবাই থেইকা দেশে ফিরছে। তোমার চাচী বলল যাও দেখি শালাডারে চক্ষের দেখা দেইখা আসো। দুবাই থেইক্যা আমাগো জন্য কিছু আনতেও পারে। এ ব্যাটা যে থুতুনিতে সৌদি দাঁড়ি রাখছে সে কথা কি আর জানতাম! সে বাঁদরটাও আবার ওর তাওয়াতো ভাতিজারে পিঠে নিয়া ঘোড়া ঘোড়া খেলতাছে। দেখ দেখি কান্ড! ওর থুঁতুনির দাড়িটাই আগে চক্ষে পড়ল। ওর মাথায় হাত দিয়া বল্লাম, বাহ বড়ই সোন্দর রামছাগলটা। বেশ বড়সড়। শালা বুঝি দুবাই থেকে আনছে। আমার কথা শুনে রামছাগল তেড়ে এলো গুঁতো দিতে। আমার কি দোষ কও?”

বেঞ্চে শুয়ে থাকা খোকা নড়েচড়ে উঠল। আমাকে লক্ষ্য করে বলল,” ভাইজান আমারে মাফ করি দিয়েন। তিন পাগলের বড় পাগল আর নাই। আল্লাহর পাগল সূফী পাগল। এখন দেখতাছি আপনার চাচা মহা ছাগল, একজন সুফী ছাগল।”
খোকার কথা শুনে চাচা বললেন,” কেডারে? জামশেদ? তুই এখানে ক্যান?” খোকা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ” জ্বে না, আমি জামশেদ না।” বলে গটগট করে চলে গেল। চাচা খিক খিক করে হেসে বললেন,” তুই জামশেদ না, তয় কি জামশেদের প্রেইত? আমি চক্ষে কম দেখি বইলা ফাঁকি দেতে চাইস?”

চাচার গল্পে কানে তালা লেগে গেল। কানের তালা খোলার জন্য বললাম,” চাচা আপনে এখানে আরাম করে বসেন। আমি ট্রেনের সংবাদ নিয়ে আসি।” চাচা উত্তরের প্রতীক্ষা না করে ষ্টেশন মাষ্টারের রুমে ঢুকি। ছোট্ট একটা সালাম দিয়ে সবিনয়ে জানতে চাই,” স্যার পাঁচটার ট্রেন কয়টায় আসবে?” ষ্টেশন মাস্টার চশমার উপর দিয়ে চোখ বের করে বললেন,” পাঁচটার ট্রেন কি কখনও দশটায় আসে নাকি? যত্তোসব পাগল ছাগলের আমাদানী।” আর কথা চলেনা। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ষ্টেশনের নলকূপটা অকেজো। পকেটে আছে মাত্র একটি টাকা। এক কাপ চা হতে পারে। চায়ের দোকানে বেঞ্চের এক কোনে চুপ করে বসলাম। অর্ডার দিলাম এক কাপ চায়ের। কি নিয়তি! চাচা মিয়া এসে ধপ করে বসলেন আমার পাশে। মিনিট খানেক নিরীক্ষা করে বললেন,” সুজন ভাতিজা না? দেখ দেখি কান্ড! তোমারে গরু খোঁজা করে হয়রান। ট্রেন নাকি দুই ঘন্টা লেইট। আমার কথা না, মাষ্টার সাহেব বললেন। আমিতো ভাতিজা চক্ষে আন্ধার দেখতাছি। তোমার চাচী বললো, সাঁঝ লাগার আগে ঘরে ফিরতে পারবা। এখন দেখ দেখি কান্ড! দুই ঘন্টা লেইট হলে তো সব আন্ধার হয়ে যাবে। ভাতিজা তুমি কিন্তু আমার লগে লগে থাকবা। না হলে আন্ধারে আমি হারাই যাব। শোননি সেবার আমি বগুড়া না নেমে ভুল করে কাহালু নেমেছিলাম। তারপর কত কান্ড। ভাতিজা তুমি কিন্তুক আমারে ছাড়বা না। তোমার নিজ দায়িত্বে আমারে গাড়িতে তুলবা, নামাইবা এবং কষ্ট কইরা তোমার চাচীর হাতে তুলে দিবা।” আমি বিনয়ে বিগলিত হয়ে বললাম,” আপনে কোন চিন্তা করবেন না চাচা মিয়া। আমি তো আছি।”

এর মধ্যে পিচ্চি চা নিয়ে এল। কাপ টেবিলে রেখে বলল,” মামু চা কিন্তুক দুই ট্যাহা কাপ। চিনির দাম বাড়ছে।” একি সংবাদ! ব্যাটা পাজী সে কথা আগে বলবি তো। চাচা মিয়া হাসি মুখে চায়ের কাপ নিতে নিতে বললেন,” দেখ দেখি কান্ড! কি দরকার ছিল চায়ের অর্ডার দেয়ার? খামোকা আমার জন্য দুটো টাকা নষ্ট করলা।” একি উৎকট ঝামেলা। আজ সকালে যে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলাম। হোটেল মালিকের কাছে বিল দিতে গিয়ে ফ্যাসাদ তো বাঁধবেই। দুটাকার চা এক টাকা নেবে কেন? তারচেয়ে কেটে পড়া ভাল। আমার কি? চা খাচ্ছেন চাচা। বিল দেবেন চাচাই। কোন রকমে গুটিশুটি মেরে কেটে পড়ি।

ট্রেনের খবরটা ভালো করে নেয়ার দরকার। সত্যি কি দুঘন্টা লেট? ষ্টেশন মাষ্টারের রুমে ঢুকে জানতে চাইলাম ট্রেনের খবর। মাষ্টার সাহেব নেহায়েত চাকুরীর খাতিরে কোন ষ্টেশনে যেন ফোন করলেন। রিসিভার তুলে টেনে টেনে বললেন’” হ্যালো…… গাবতলী……….হ্যালো………..কে? সেকেন্দার? ওয়ালাইকুম। হ্যাঁর হ্যাঁ ভাল আছি। ও আচ্ছা বড় বাবুকে দাও। কে বড় বাবু? স্লামালেইকুম। আরে ভাই গরীবের ভাল থাকা আছে নাকি? না না রহমান আসে নাই। অ্যাঁ তাই নাকি? তা একদিন আসেন। ভাবীকেও নিয়ে আসবেন। কি যে বলেন! আচ্ছা রাখি। খোদা হাফেজ।” মর জ্বালা! ষ্টেশন মাষ্টার আমাকে দেখে ফিক করে হেসে বললেন,” এই যা: ট্রেনের খবরটাই নেয়া হলনা। আরে ভাই খবর নিয়ে কি করবেন? চুপচাপ বসে এক দুই গোনেন, ঘন্টা বাজলেই ট্রেন আসবে।”

পিছন ঘুরে চাচা মিয়াকে দেখে কলজে শুকিয়ে গেল। চাচা কিছু বলার আগেই বললাম,” আপনি উঠে এলেন যে! আমি ভাবলাম আপনি বসে বাসে চা খান আর আমি ততোক্ষণে ট্রেনের খবরটা নিয়ে আসি।”
“দেখ দেখি কান্ড! তুমি তো উঠে আইলা। আধা ঘন্টা পরেও তোমারে পাইলাম না। আমার কাছে পাঁচটা পয়সাও নাই। চায়ের বিল দেই কি করে? মালিক বেটা আমারে ছাড়তে চাইল না। বলল, হোটেলের প্লেট গ্লাস পরিস্কার কইরা দিয়া চায়ের দাম শোধ করেন। ভাগ্য ভাল এক ভদ্রলোক দয়া করে চায়ের দামটা দিলেন। ভাতিজা দেখ দেখি কান্ড, বড়ই লজ্জার কথা। ওনাকে আমি পাঁচবার সালাম দিয়েছি, তবুও মনে হইতেছে সালাম দেয়া কম হইছে। ভাতিজা, আমার গল্প শুনে উনি জানালেন কম কথা বলা লোক উনার খুব পছন্দ। তাহলে উনি আমারে পছন্দ করছেন। কি বলো ভাতিজা? আমিতো কথা কমই বলি। আর আমারে পছন্দ না করলে চায়ের দামই বা দেবেন কেন?”

রাত নয়টা। বেঞ্চে বসা আমি আর চাচা। ট্রেনের সংবাদ নেই। খবর নিতে গেলেই মাষ্টার সাহেব বলেন, আরে ভাই ঘন্টা পড়লেই ট্রেন আসবে।”
হঠাৎ সাড়ে নয়টায় ঢং ঢং করে কানে এলো ট্রেন আসার ঘন্টা। খুশিতে চাচাকে বসে রেখে ছূটলাম অফিস ঘরের দিকে। ওখানে ছোট খাটো একটা জটলা। দেখি সেই খোকাকে পয়েন্টম্যান হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর বলছে,” বল ঘন্টা দিলি ক্যান?” খোকা কাঁদ কাঁদ হয়ে বলল,” আমার কি দোষ? মাষ্টারবাবু বললে ঘন্টি বাজলি গাড়ি আসবো। তাই ঘন্টি দিলাম। এইটা কি দোষের কন? হক্কলের সুবিধাই হইল।”

চাচার কাছে ফিরছি অমনি মুখোমুখি হল হায়দার। আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। টেনে জোর করে নিয়ে গেল উন্নতমানের এক রেস্টুরেন্টে। খাওয়ালো। সুখ দু:খের গল্প করল ঘন্টাখানেক।

অবশেষে পাঁচটার ট্রেন আসল রাত এগারটায়। এরমধ্যে নেমেছে মুষলধারে বৃষ্টি। লোকে গিজগিজ করছে প্লাটফর্ম। বৃষ্টি থেকে গা বাঁচিয়ে অনেক কষ্টে একটা বগিতে উঠলাম। প্রচন্ড ভীরে প্রচন্ড চাপাচাপি। কোন রকমে পা দুটো রাখার জায়গা পেয়েছি। পা একদিকে, শরীর আর এক দিকে। নট নড়ন-চড়ন। ট্রেন ছেড়ে দিল। হঠাৎ আমার কোমরে শিরশির করে উঠল। উষ্ণ গরম পানির স্পর্শ পেলাম। বৃষ্টি কি ট্রেনের ভিতরেও শুরু হল নাকি? নাকি ট্রেনের ছাদ ফুটো? চোখ ঘূরে দেখি এক মহিলা তার দেড় দুই বছরের বাবুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভীড়ের কারনে লক্ষী বাবু বাইরে হিসু করার চান্স পায়নি। হয়তো আর ধরে রাখতে পারেনি, বাধ্য হয়েই আমার গায়ে করে দিয়েছে। ভদ্রমহিলা লজ্জা পেয়ে হাসি আড়াল করে বললেন,” দেখ দেখি কান্ড! ছি: বাবু!”

হঠাৎ আমার চাচা মিয়ার কথা মনে পড়ল। এভাবে তাকে ছাড়া কি ঠিক হল? আমার কি দোষ? সব দোষতো হায়দারের।

(মোট পড়েছেন 287 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

১টি মন্তব্য

  1. লরা ক্রফট লরা ক্রফট বলেছেন:

    আপনার রম্য ধাঁচের গল্পের মধ্যেও একটা হাহাকার আছে। সুন্দর হয়েছে। :c

মন্তব্য করুন