মেধা ও শিক্ষা জীবনে সফলতার জন্য আবশ্যক : নয় পৃথিবীর কোনো সফল মানুষ শিক্ষিত ও মেধাবী নয়

- ওবায়দুল করিম খান

আমরা সারা জীবন শুনে আসছি শিক্ষা, মেধা ও কঠোর পরিশ্রম জীবনে সফলতার চাবিকাঠি। শিক্ষকরা  আমাদের সেই শিশুকাল থেকে এ কথাই শিখিয়েছেন। অভিভাবকদের কাছ থেকেও আমরা শিখেছি, শিক্ষাই জীবনে উন্নতির মূল কথা। আমরা যখন অভিভাবক হয়েছি তখনও আমাদের সন্তানদের একই শিক্ষা দিয়ে চলেছি। দেশের অসংখ্য অভিভাবক তাদের সন্তানদের সফল জীবনে জন্য সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করছেন। এখন প্রশ্ন হলমেধা  থাকলে এবং কঠোর পরিশ্রম করলেই কি আসলেই জীবনে সাফল্য পাওয়া যায় ? এই প্রবন্ধে এই প্রশ্নের খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। সন্তানদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা তৈরিতে এই লেখা কিছুটা কাজে আসতে পারে।

 

বর্তমান প্রজন্ম সফলতাকে কিভাবে মূল্যায়ন করে

এখন কথা হল, সফলতা কাকে বলে। এর অসংখ্য সংজ্ঞা আছে।প্রকৃতপক্ষে সফলতার ধারণা নির্ভর করে বিভিন্ন সমাজের মানুষের আকাঙ্খা ও মন-মানসিকতার ওপর। সফলতার ধারণা সমাজের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তনশীল। সফলতা বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি, সম্পদ, খ্যাতি ও ক্ষমতা। কিন্তু সফলতার এই সংজ্ঞায় ইদানিং পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসট্রেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণামূলক জরিপে দেখা  গেছে শতকরা ৯০ ভাগ মার্কিন নাগরিক সফলতা বলতে বোঝে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানো এবং পারিবারিক ও সামাজিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা।গবেষণা দলের প্রধান ড মাইকেল প্লাটার বলেন, মানুষ সাফল্যের প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে, ভালোভাবে ও সুস্থ্যভাবে বেচেঁ থাকাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইউরোপেও মানুষের একই ধরনের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে।  বাংলাদেশে  এ ধরনের গবেষণামূলক জরিপ সম্ভবত হয়নি। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনেহয়, বর্তমান প্রজন্ম সফলতার পুরানো ধারণাটাকে অত জটিলভাবে নেয় না। সবাই সচ্ছল, নির্ঝঞ্জাট জীবন চায়। সবাই চায় একটা সুন্দর পরিবার, মনের মত বাড়ি ও গাড়ি থাকার মত আর্থিক স্বাধীনতা । মানুষ আগের মত বিশাল খ্যাতি ও ক্ষমতা প্রাপ্তি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত নয়।

 

 সফলতা অর্জনে মেধার গুরুত্ব বেশী নয়

 আমার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে আমি অনেক সফল বাক্তিকে পরামর্শ দিয়েছি, অনেক পরামর্শ নিয়েছি। কর্মজীবনে অনেক রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও ধনী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। অনেকের সফলতার পথগুলো আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি কখনই সফলতার সাথে মেধার সম্পৃক্ততা দেখিনি।

 পৃথিবীর সবচেয়ে সফল বাক্তিদের স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করার মত মেধা নেই। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সফল বাক্তি ফেসবুকের মার্ক জুকারবার্গ ও বিল গেটস কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার হতে পারেননি। এদের কেউ স্কুল পালানো আইনস্টাইনের মত মেধাবী নয়।

 আমরা যাকে মেধা বলি তা পরিমাপের জন্য আইকিউ টেস্ট করা হয়। আইকিউ যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মান নির্ধারনের সুচক। এই মেধা কখনো কখনো জীবনে সফলতা পেতে সামান্য কিছু ভূমিকা রাখে বটে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা অপ্রয়োজনীয়। কার্নেগী ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৫ % অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক সফলতার সাথে মেধার কিছু সম্পৃক্ততা আছে আর সিংহভাগ অর্থাৎ ৮৫ % সফলতা এসেছে আলাপ আলোচনা, সমাযোজন ও নেতৃত্ব দেওয়ার পারদর্শিতা থেকে। মার্কিন মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ যাকে ভালো লাগে, যাদের বিশ্বাস করে এবং দায়িত্বশীল মনে করে তাদের চেয়ে পছন্দনীয় মনে করে তাদের সাথে ব্যবসা করে। এমনকি সেই পছন্দের বাক্তিটি বেশি  দামে, নিন্মমানের পণ্য সরবারহ করলেও তারা তা মেনে নেয়। গবেষণা না হলেও বাংলাদেশের চিত্রও মোটামুটি একই বলা যায় ।যারা বাকপটু, কথা বার্তায় সবাইকে খুশি করতে পারে, এক কথায় যারা আকর্ষনীয় বাক্তিত্বের অধিকারী, তাদের  গ্রহণযোগ্যতা বেশি। কর্মক্ষেত্রেও তাদের দ্রুত পদোন্নতি হয়।

 তারা যে কোনো অফিস থেকে নিজেদের যেকোনো কাজ সহজে করিয়ে নিতে পারে। বুদ্ধি, বিবেচনা, যুক্তি দিয়ে কথা বলা এক্ষেত্রে তেমন কাজে লাগে না। আমাদের দেশে তথাকথিত ভালো ছাত্ররা যদি গতানুগতিক গন্ডি থেকে না বের হয়, তাহলে তাদের জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। কর্মদিবসে এক গাদা ফাইলের মধ্যে ডুবে থাকা, রুটিন মাফিক বাড়ি আবার কাজে যাওয়া, এমন জীবনকে সফল বলা যায় না.

 

আবেগীয় মেধা বেশি কার্যকর

প্রচলিত মেধা অকার্যকর বা কম কার্যকর হয়ে যাওয়ায় মনোবিজ্ঞানীরা এখন EQ Emotional Intelligence আবেগের বুদ্ধিমত্তা ধারণার কথা বলছেন। এই ধারণার প্রবক্তা নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দানিয়েল গলমান  প্রমান করেছেন, আবেগের বুদ্ধিমত্তা প্রচলিত মেধার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

 আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার বলতে বাক্তির আবেগ বোঝার ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, মূল্যায়ন ও প্রকাশ করার ক্ষমতা বোঝায়। এই বুদ্ধিমত্তা আকর্ষনীয় বক্তিত্ব, অন্যদের সঙ্গে সংযোগ এবং  আলোচনা ও আপোষ করার পারদর্শিতার সাথে সম্পর্কিত। হার্দেল গ্রুপের গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগের বুদ্ধিমত্তা ব্যবসা ও বানিজ্যের প্রসার ঘটানোর জন্য জরুরি। একারণে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি নিয়োগের ক্ষেত্রে ইকিউ EQ উপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করছে। আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পর সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ কোর্স চালু করা হয়েছে।

 এই লেখাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমেরিকার জরিপ ও গবেষণার উল্লেখ করতে হয়েছে কারণ বাংলাদেশে এই বিষয়ে কোনো গবেষণামূলক তথ্য ও উপাত্ত পাওয়া সহজসাধ্য নয়। তবে বিশ্বায়নের এই যুগে সবকিছুর প্রবণতা সবদেশেই একই রকম। (সবকিছুর প্রবণতা কথাটার বদলে মানুষের আশা-আকাঙ্খা ও ধ্যান-ধারণার প্রবণতাগুলো-বলা যায়?)

 বিশ্বের সব দেশেই চাকরি ও পেশার ক্ষেত্রে সামাজিক দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে। নিউয়র্ক টাইমসের গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকার শ্রম বাজারে ব্যপক পরিবর্তন ঘটছে এবং গত ৩৫ বছরে সামাজিক দক্ষতার প্রয়োজন হয় এমন চাকরি ক্রমশ বাড়ছে। সমন্বয়, যোগাযোগ ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা সব চাকরিতেই বাড়ছে।

 আমি নিজে ডেনমার্কে অনেকগুলো কোম্পানিতে খন্ডকালীন চাকরি করেছি।  সব কোম্পানিতেই দেখেছি, যে তরুনদের ব্যক্তিত্ব আকর্ষনীয়, অন্যদের কনভিন্স করার দক্ষতা বেশি তারা অন্যদের টপকে কোম্পানি প্রধান হয়ে যায় আর যারা পুরানো সংজ্ঞায় মেধাবী তারা পিছনে পড়ে থাকে। গুগল ও মাইক্রসফ্ট এই প্রবনতার উদাহরণ। সুন্দর পেচাই এমন কোনো দক্ষ প্রকৌশলী না হয়েও তরুণ বয়েসে আজ গুগলের প্রধান কর্মকর্তা।

 

 মেধার নতুন মাত্রা

প্রচলিত অর্থে মেধা সাফল্যের জন্য প্রয়োজন হয় না, তবে আবেগীয় মেধার প্রয়োজন হয়। অন্যদের বোঝানোর ক্ষমতা ও সাংগঠনিক কাজের ক্ষমতা এক অর্থে মেধা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইকিউ টেস্টের কোনো ফলাফল আমরা দেখিনি কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, তার মেধা গড়পরতা মেধার চেয়ে বেশি হবে না। কিন্তু আবেগীয় মেধার কথা বিবেচনা করলে, জনগনকে বোঝানোর ক্ষমতা, যোগাযোগ ও সংযোগ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতায় ট্রাম্প একজন জিনিয়াস। প্রচলিত মেধা অনেকটা গাণিতিক, সংখ্যা বিশ্লেষণের উপর নির্ভর করে. সামাজিক দক্ষতা অনেকটা বর্ণনামূলক.

 

 মেধা ও শিক্ষার সমার্থক নয়

মেধা ও শিক্ষার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নেই. অনেক মেধাবী ছাত্র পরীক্ষায় ভালো করে না. আমরা প্রায়ই রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের উদাহরণ দেই. অনেক মেধাবী ছাত্র অনেক কারণে ভালো শিক্ষা লাভ করে না. এর বড় কারণ হলো, তার পঠিত বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারে না. অন্য দিকে সাধারণ ছাত্ররা মননিবেশ সহকারে উচ্চশিক্ষা লাভ করে. কার্নেগী ইনস্টিটিউট এর গবেষণায় দেখা গেছে অনেক পিএইচডি গবেষকের মেধা উবারের টাক্সিচালকদের চেয়েও কম. আমরা যাকে পুথিগত বিদ্যা বলি, তা দিয়ে মেধা শিক্ষালাভ করা যায়, এই গবেষণায় সেটাই দেখা গেছে.

এখন আরেকটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে সফলতার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন আছে কিনা. আমার ধারণা, শিক্ষাকে যতটা অতিরঞ্জিত করা হয়, অত আবশ্যক নয়. ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য শিক্ষার যতটুকু প্রয়োজন আছে তার চেয়ে মানবসভ্যতা বিকাশের জন্য বেশী প্রয়ন আছে. আমরা পৃথিবীর যে বড় সমস্যার কথায় ধরি না কেনো যেমন ক্ষুধা ও দরিদ্রের বিমোচন, পরিবেশ বাচানো, জীবন বাঁচানো সবকিছুর সমধানের প্রক্রিয়া বহুমুখী আর এর মধ্যে একটা উপাদান শিক্ষা থাকেই.

পৃথিবীর সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন আছে. তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন সীমিত. তবে বড় কথা মেধা ও শিক্ষা এক নয়.

 

শেষ কথা

যুগ যেভাবে পালাটাচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে প্রথাগত শিক্ষা ও বুদ্ধি দিয়ে চাকরি ও পেশায় ভালো করা সম্ভব হবে না। অভিভাবকরা সন্তানদের ভবিষ্যতে নিয়ে ভাবেন এবং সবকিছু করেন। এখন তাদের একটু ভিন্ন ভাবে ভাবতে হবে। এই লেখায় সেই ভাবনার ওপরই আলাকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।

 বাংলাদেশের তরুনদের মন মানসিকতা ও জীবনের লক্ষ্য ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। শ্রমবাজারের সম্ভাব্য পরিবর্তন ও ভবিষ্যত চাহিদার উপরও গবেষণা প্রয়োজন।

 

(মোট পড়েছেন 101 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন