ঘোর

- নাজমুল আহসান

পায়ের কাছে খসখস শব্দ হচ্ছে। জাহেদ চেষ্টা করছে চোখ না খুলতে, কিন্তু চোখ খুলে যাচ্ছে! এর আগেও এরকম হয়েছে। না চাইলেও মাঝে মাঝে হাত-পা, বিশেষ করে চোখ হুটহাট একটা কিছু করে বসে! ব্যাপারটা বিরক্তিকর। এই যেমন এখন, জাহেদ জানে শব্দটা কীসের। পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে কেউ বসে আছে; এটা দেখার জন্যে চোখ খোলার দরকার নেই, কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চোখ খুলে যাবেই! প্রাণপণ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে শেষমেশ চোখ খুলে ফেলল।

ট্রেনের পুরো কামরা ফাঁকা। জাহেদ ঘড়ি দেখল, বারোটা পঁয়ত্রিশ। টানা এক ঘণ্টা ঘুমিয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সর্বশেষ সময় দেখেছিল এগারোটা চল্লিশ, ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে। তখনো ট্রেনে গিজগিজ করছিল মানুষ। এই সময়ের মধ্যে সব লোক নেমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক। ট্রেন এখন কোথায় জানা দরকার। ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বের করল জাহেদ। রেললাইনের পাশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘরবাড়ি শোঁ শোঁ করে পিছনে ছুটে যাচ্ছে। বাইরে যতদূর চোখ যায় গুমোট অন্ধকার। অনেক দূরে আবছা একটা আলো, তাকিয়ে থাকতে থাকতেই টুপ করে নিভে গেলো। সাথে সাথে জাহেদের মনে পড়ল খসখস শব্দটার কথা।

হাতব্যাগ থেকে টর্চ বের করে পায়ের কাছে আলো ফেলল, একটা চিপসের প্যাকেট ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। দুদিক থেকে দুইসারি পিপড়া চিপসের প্যাকেটে ঢুকছে। বামদিকের সারির একটা পিপড়া বেশ বড়সড়। ছোটগুলোকে হটিয়ে দিয়ে এটা কেন সবকিছু দখল করছে না ভেবে অবাক লাগছে। চোখ ঘুরিয়ে বাইরে তাকাতেই ভয়ে জমে গেলো জাহেদ। পায়ের কাছে একটা ছায়ামূর্তি। আড়চোখেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। জাহেদ বেশ দ্বিধায় পড়ে গেল, তাকাবে না ভাবলেও বরাবরের মতোই চোখ চলে এলো। কিছু নেই!

ঘটনা এ পর্যন্ত হলে ও এটাকে চোখের ভুল হিসেবে ধরে নিত; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- একটু আগে দেখা চিপসের প্যাকেটটা নেই, এমনকি পিঁপড়ার সারিও উধাও! জাহেদ পিছনে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এখন একটা দোয়া পড়তে হবে। জাহেদ কোনোভাবেই দোয়াটা মনে করতে পারছে না, এমনকি দোয়ার নামটাও মনে পড়ছে না! যেটা মনে পড়ছে, সেটা হচ্ছে ‘টুইংকল টুইংকল, লিটল স্টার’! এরকম সময়ে এই ছড়া পড়া উচিৎ হবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। হঠাৎ করে একটা দোয়া মনে পড়ল, ‘বিসমিল্লাহি মাজরেহা ওয়া মুরছাহা…’। এই দোয়া মনে পড়ার কারণ স্পষ্ট, বাসে যাতায়াতের সুবাদে দিনে কয়েকবার দোয়াটা চোখে পড়ে। জাহেদ চোখ বন্ধ করে মনে মনে ‘বিসমিল্লাহি মাজরেহা ওয়া মুরছাহা’ পড়তে লাগলো।

ক্যাড়ক্যাড় শব্দে যখন ঘুম ভাঙ্গল, তখন ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়েছে। জানালা দিয়ে স্টেশনের নাম দেখা যাচ্ছে- মোহনপুর, এখানেই নামতে হবে। প্ল্যাটফর্মে পা ফেলে আরেকবার চমকে উঠল জাহেদ। পুরো প্ল্যাটফর্মে একটা মানুষের ছায়া পর্যন্ত নেই। প্ল্যাটফর্মের পশ্চিম দিকে পরপর কয়েকটা দোকান। এরা সবাই গড়পড়তা একটা-দেড়টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখে, আজ এতো তারাতারি বন্ধ করেছে ফেলেছে কেন? কব্জি উল্টিয়ে ঘড়ি দেখল, বারোটা পঁয়ত্রিশ! ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। এতক্ষণে ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। ট্রেনে ও তাহলে এক ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়েছে! এই ‘এক ঘণ্টার বেশি’র পরিমাণ জানতে হলে সময় দেখতে হবে। স্টেশনের মসজিদের দরজা হাট করে খোলা, সময় দেখার জন্যে মসজিদে ঢোকা উচিৎ হবে কিনা কে জানে! বাইরে থেকে মসজিদের দরজা দিয়ে সরাসরি দেয়ালঘড়িতে আলো ফেলল জাহেদ। পৌনে তিনটা। বাড়ি পৌঁছতে দেড় ঘণ্টার মতো লাগবে, ততক্ষণে নিশ্চয়ই মা নামাজ পড়ার জন্যে উঠে পড়বে।

স্টেশন থেকে উত্তরে যে পথটা গেছে, সেটা ধরে মোটামুটি তিন কিলোমিটার হাঁটতে হয়। প্ল্যাটফর্ম থেকে মিনিট পাঁচেক হাঁটলে প্রথম যে মোড়টা, সেখানে এসে জাহেদ দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে বহু বছরের পুরনো ডোবা, ডানদিকে জাহেদদের গ্রামের রাস্তা, বামদিকে একটা। বামদিকের রাস্তাটা ধরে একটু সামনে গেলেই মিলিদের বাড়ি। জাহেদ যেদিন ঢাকায় চলে যায়, মিলি খুব কাঁদছিল। জাহেদ অবাক হয়ে আবিস্কার করেছিল, সুন্দরী মেয়েদের কাঁদলে আরো বেশি সুন্দর দেখায়! মিলিকে কথা দিয়েছিল, ঢাকায় গিয়ে প্রতি সপ্তাহে চিঠি লিখবে, আর বাড়ি এলে তো দেখা হবেই। ও ঠিকই চিঠি লিখত, তবু কেন যেন মিলি ধীরে ধীরে সরে গেল। তারপর হুট করে একদিন খবর পেল, মিলির বিয়ে হয়ে গেছে!

কানের পাশ দিয়ে সাঁই করে একটা কিছু চলে গেল। চমকে উঠে পিছনে তাকাল, কিছু নেই। মাথা ঘুরিয়ে সামনে তাকাতেই ভয়ে কাঠ হয়ে গেল জাহেদ। ডোবার মাঝামাঝি জায়গাটাতে একটা মানুষের লাশ। চাঁদের আবছা আলোতেও স্পষ্ট দেখা যায়। লাশের পুরো শরীরে একটা সুতোও নেই। পিঠের অংশটুকু দেখে মনে হচ্ছে অল্পবয়স্ক যুবতী। জাহেদের একবার ইচ্ছে করল কাছে গিয়ে লাশটা দেখতে। পরক্ষণে ইচ্ছেকে চাপা দিতে হল। এই মাঝরাতে ডোবার মধ্যে ভেসে থাকা যুবতীর লাশ দেখার মতো সাহস জাহেদের কোনোকালেই ছিল না; তাছাড়া আশেপাশে লোকজনও নেই, একা একা বিপদ টেনে আনার মানে হয় না। ডানের রাস্তা ধরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করার মুহূর্তে মনে হল- ডোবার পানিতে একটা আলোড়ন হচ্ছে। ও হালকা দেখল- লাশটা উঠে দাঁড়াল! এবার আর পিছনে দেখার মতো সাহস হল না জাহেদের। দ্রুত পা চালাতে শুরু করল।

আদালত শেখের বাড়ির সামনে পৌঁছার পর জাহেদ অবাক হয়ে গেল। এতো তারাতারি চলে এসেছে! শেখ বাড়িতে একটা বিরাট আমগাছ ছিল। এই কয়েক বছর আগেও জাহেদরা এখানে আসতো, আম চুরি করতে। অদ্ভুত স্বাদের সেই আম চুরি করার জন্যে ছেলেছোকরাদের যেমন অভাব ছিল না, তেমনি পাহারা দেওয়ার জন্যে ছিল বাঘা, শেখ বাড়ির বিশালদেহি কুকুর। সেবার এক ঝড়ের রাতে গাছের একটা ডাল ঘরের উপর ভেঙ্গে পড়ল। চাপা পড়ে মারা গেল আদালত শেখের সাত বছরের একমাত্র মেয়ে। ঘটনার কয়েকদিন পর পুরো গাছ কেটে ফেলা হল। জাহেদদের আম খাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল। মনে হচ্ছে এই সেদিনের ঘটনা, সব স্পষ্ট মনে আছে। গাছটা ছিল ইংরেজি ওয়াই-এর মতো, মাটি থেকে হাত পাঁচেক উঠে দুই দিকে দুইটা বিশাল ডালে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। ভেঙ্গে পড়েছিল পশ্চিমদিকের ডালটা।

-‘কে যায় রে?’ রিনরিনে একটা কণ্ঠ জিজ্ঞেস করল! ঘাড় ঘুরিয়ে জাহেদ মুগ্ধ হয়ে গেল। আমগাছের ওয়াই-এর মধ্যে বসে আছে তুলি, আদালত শেখের মেয়ে। ফুটফুটে পরীর মতো মেয়েটাকে সাদা ধবধবে পোশাকে অপার্থিব লাগছে।
-‘তুলি? ওখানে কী করছ?’ জাহেদ তুলিকে চিনত।
তুলি কাঁদকাঁদ গলায় বলল, ‘আমাকে একটু নামিয়ে দাও না প্লিজ!’
জাহেদ বুঝতে পারছে ওর হেলুসিনেশন হচ্ছে- তুলি মারা গেছে অনেকদিন আগে, তাছাড়া গাছটাও নেই; এখন যা দেখছে সব কল্পনা। তবু অমোঘ আকর্ষণে ও এগিয়ে গেল। তুলিকে গাছ থেকে নামিয়ে দিল।
নিচে নেমেই খিলখিল করে হাসতে লাগলো তুলি, ‘সেই কখন থেকে বসে আছি গাছে, কেউ নামিয়ে দেয় না! কতগুলো আম দ্যাখো। এই একটা তোমার-’
জাহেদ দেখল ওর দুই হাতে চারটা আম। তুলি একটা আম জাহেদের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। জাহেদ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তুলির নিষ্পাপ হাসি দেখতে লাগলো। কী অদ্ভুত রকম সুন্দর!

পিছন থেকে কেউ কাঁধে হাত রাখল, ‘এখানে কী করিস জাহেদ?’
-‘বাবা, তুমি!’
-‘তোকে এগিয়ে নিতে এলাম।’
জাহেদ বলল, ‘কিন্ত আমি আজ আসব, এটা তুমি কীভাবে জানলে?’
জাহেদকে আশেপাশে তাকাতে দেখে বাবা বুঝতে পারলেন, ‘চল যাই, ও চলে গেছে!’
তুলি নেই, এই ফাঁকে হয়তো বাড়িতে চলে গেছে। পরক্ষণেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জাহেদ আবিস্কার করল, আমগাছটা নেই। আমগাছের জায়গাটাতে দিব্যি একটা ঘর দাঁড়িয়ে আছে! কিন্তু বাবা এই সময় এখানে কেন!
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আসবি সেটা বাড়িতে জানাবি না?’
-‘আমি গিয়েছিলাম গাজীপুরে, আমার এক বন্ধুর বোনের বিয়েতে। ওখানেই খবর পেলাম ভার্সিটি অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করেছে। ভাবলাম বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।’
-‘তো সেটা জানাতে পারতি। আর তোকে তো চিঠি দেওয়া হয়েছে, পাসনি?’
-‘আমি তো হল থেকে বের হয়েছি ছয়দিন আগে, চিঠি পাবো কীভাবে?’
বাবা মনে হল আশাহত হলেন, ‘ও! কয়টা বাজে?’
-‘আমার ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাবা, তুমি কীভাবে জানলে আমি আসব?’
বাবা বললেন, ‘স্বপ্নে দেখলাম তুই আসছিস, পথে তোর গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে!’
জাহেদ অভিভূত হয়ে গেল, ‘তাই বলে এই রাতে তুমি চলে আসবে!’
বাবা বললেন, ‘তারাতারি চল, নিবারণকে হয়তো ঘাটে পাওয়া যাবে।’

এর মধ্যে ফজরের আজান হয়ে গেল। বাকি পথটা বাবা কোনো কথা বললেন না। ঘাটের কাছে শতবর্ষী মসজিদ। বাবা বললেন, ‘তুই এক কাজ কর, বাড়ি চলে যা। আমি এই মসজিদে নামাজ পড়ি। আর শোন-’
জাহেদ দাঁড়িয়ে পড়ল। বাবা বললেন, ‘আমার হাতঘড়িটা নিয়ে যা। তোরটা তো নষ্ট, এটা পড়িস।’

নিবারণ কাকা বসে ছিলেন ঘাটে। কিছু বলতে হল না, জাহেদকে দেখে উঠে এলেন। বাকি পথ জাহেদ নির্বিঘ্নেই এলো। চারদিক ফর্সা হয়ে গেছে। বাড়ির উঠোনে পা দিতেই কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল। মা গুণগুণ করে কোরআন তেলাওয়াত করছে। জাহেদ চুপচাপ ঘরে ঢুকে পড়ল। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই রাজ্যের ঘুম এসে চেপে ধরল।
একটু পর মা ঘরে ঢুকলেন। জাহেদ উঠে বসল, ‘কেমন আছ মা?’
মা কোনো উত্তর দিলেন না। কয়েক সেকেন্ড পর হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। জাহেদ কিছু বুঝতে না পেরে হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকলো। কান্নাকাটির শব্দ শুনে বিলকিস এগিয়ে এলো, ‘আপনে খবর পান নাই? খালুজান আপনেরে খুব দেখতে চাইতেছিল!’

জাহেদ অবাক বিস্ময়ে কব্জিতে পড়া বাবার হাতঘড়িটা দেখতে লাগলো।

(মোট পড়েছেন 173 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

৭টি মন্তব্য

  1. শেষটায় এসে মন খারাপ হয়ে গেল 🙁
    তুলি অনেক কিউট। (3

    অনেক ভালো হয়েছে গল্পটা (y) -{@

  2. রানা রানা বলেছেন:

    ভাল লাগলো (y) শেষের দিকে চোখে পানি এসে গেল ;(

মন্তব্য করুন