দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকাল ও বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ

- মাহবুবুল আলম

 

 

দেশব্যাপী পরিকল্পিত টার্গেটেড কিলিং  ও জঙ্গি তৎপরতা, মুক্তমনা লেখক-ব্লগার, ইমাম, পুরোহিত, খ্রিষ্টান ধর্মযাজক,  বৌদ্ধভিক্ষু, ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা এবং সর্বশেষ ঢাকার গুলশানে পরিকল্পিত জঙ্গী হামলায় দেশী-বিদেশি নাগরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা এবং এর পাঁচ দিনের পরেই দেশের সর্ববৃহত ঈদের জামায়াত শোলাকিয়ায় জঙ্গিহামলা দেশি-বিদেশী নাগরিকদের হত্যা ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক জাগরণের সৃষ্টি হয়েছে। এই জাগরণে অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ জঙ্গি নামক মানুষরূপী দানবদের প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে বিক্ষোভে ঘৃণায় ফুঁসে ওঠেছে। এর মধ্যেই দেশে যে সাংস্কৃতিক জাগরণের সৃষ্টি হয়েছে তা মনে করিয়ে দেয় বাহান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর ও নব্বই-এর গণজাগরণের কথা।

ইতমধ্যে বিএনপি-জামায়াত সৃষ্ট জঙ্গিবাদী ফাঙ্কেনস্টাইন বা মানুষ্য দানবদের প্রতিরোধের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মানের যেকোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে দেশবাসিকে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানিয়ে দেশের কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। বাহান্ন ও একাত্তরের মতো চলমান পরিকল্পিত জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সাধারণ মানুষকে সোচ্ছার ও ঐক্যবদ্ধ করতে সর্বস্তরে সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তোলতে হবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন সবাই। দেশের মুক্তচিন্তা ও বিবেকের মানুষ মনে করে সরকারের একার পক্ষে জঙ্গিবাদ নামক দানবদের প্রতিহত করা সম্ভব নয়, তা ছাড়া এটা সরকারের একার দায়িত্ব নয়, তাই দেশের এ ক্রান্তিকালে দেশের সুনাগরিকদের যার যার অবস্থান থেকে দৃঢ় মনোবোল নিয়ে এগিয়ে আসা খুবই প্রয়োজন। 

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্তর্নিহিত চেতনায় শতকের পর শতক ধরে সব ধর্মের মানুষ সকল ভেদাভেদ ভুলে একই সংস্কৃতির ছাতারতলে সমবেত হয়ে ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠান রীতিনীতি সামাজিক উৎসব পালন করে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে অসাম্প্রায়িক চেতনায় বেড়ে ওঠেছে। এর ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে বাঙালির সংস্কৃতির একটি পরিশীলিত ধারা। সেই ধারার মতোই এই ব-দ্বীপে বেড়ে ওঠা সব মানুষেই এর পলিমাটির মতোই নরম আবার চৈত্রের কঠিন পাথরের রূপ মাটির চরিত্র বহন করে আছে। এটাও আমাদের একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এখানের মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নরমের সাথে নরম এবং গরমের সাথে গরম আচরণ । বাঙালি জাতিকে ভালোবেসে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক কিছুই আদায় করা যায়। কিন্তু ভয় ও রক্তচক্ষ দেখিয়ে এ জাতিকে কোনদিনই দমিয়ে রাখা যায়নি।

এ জাতিকে চটালে খবর আছে যার প্রমাণ পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক শাসন শোষণ ও বঞ্চনায় অতিষ্ঠ হয়ে  বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন,  বাষট্টি’র ছাত্র আন্দোলন, ছেষট্টি’র বঙ্গবন্ধুর ছয়-দফা,  ঊনসত্তর-এর গণ-অভ্যুত্থান, সত্তর-এর সাধারণ নির্বাচন, তার পথ বেয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালিরা স্বাধীনতা অর্জন করে বুঝিয়ে দিয়েছিল এ জাতিকে ক্ষেপিয়ে তুললে এর পরিনতি কি হতে পারে। এরপর স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সামরিক শাসন, স্বৈরাচারী একদলীয় শাসন শোষণ নির্যাতন সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমে সফলতা অর্জিত হয়েছে। জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসন, এরশাদের নয় বছরের স্বৈরশাসন যা নব্বই এর গণআন্দোলনের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। এরপর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার আড়ালে একদলীয় স্বৈরশাসনের ৯৬ সালের সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাগ্রহণ এবং গণজাগরণ তথা সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমে ১৭ দিনের মাথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে নির্বাচন দিয়ে খালেদা জিয়াকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। সর্বোপরি ১/১১ তত্ত্বাবধক সরকারের আড়ালে সেনাশাসিত সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার সকল ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমেই। এই যে বাঙালির জীবনের আন্দোলন-সংগ্রাম ও জীবনের বিভিন্ন ক্রান্তিময় অধ্যায় বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে তার কিন্তু রয়েছে এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তাধীকারের চেতনা। একথা বললে অত্যুক্তি হবেনা যে, দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে রাজনৈতিক দল যখন ব্যর্থ হয়েছে, কবি-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন পেশাজীবীরা পথে নেমে এসেছেন। এবং প্রতিবারই বিজয় ছিনিয়ে ঘরে ফিরেছেন তারা।

এবারও গুলশানে পরিকল্পিত জঙ্গী হামলায় দেশী-বিদেশি নাগরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা এবং এর পাঁচ দিনের পরেই দেশের সর্ববৃহত ঈদের জামায়াত শোলাকিয়ায় জঙ্গিহামলা দেশি-বিদেশী নাগরিকদের হত্যা ও  অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক জাগরণের সৃষ্টি হয়েছে। ‘হলি আর্টিজান’এর জঙ্গিহামলা যেন স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে বাঙালীর মনে। তাই তারা আর চুপ করে ঘরে বসে থাকতে পারলেন না। জঙ্গীবাদের কালো থাবায় বিক্ষত হৃদয় নিয়ে প্রতিবাদে প্রতিবাদে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মাঠে নামলেন দেশের সংস্কৃতিকর্মীরা। ২৩ জুলাই ২০১৬  শহীদ মিনার থেকে গুলশান পর্যন্ত গান কবিতার মিছিলে সাফ জনিয়ে দেয়া হলো ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানে অর্জিত এই বাংলাদেশ কোন জঙ্গীবাদ হত্যার লীলাভূমিতে পরিণত হতে দেয়া হবে না।

তাই মানুষে মানুষে সংস্কৃতির চেতনা জাগিয়ে তুলে বাঙালী ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান এসেছে প্রতিবাদ সমাবেশ ও র‌্যালী থেকে। আহ্বান জানানো হয়েছে ঐতিহ্য শান্তি-সম্প্রীতির সঙ্গে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের বাংলাদেশ সেই চেতনাতে জাগ্রত করে তোলার। সাংস্কৃতিক কর্মীদের সাথে মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তচিন্তার মানুষ যোগ দেন জঙ্গীবাদ রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে। মানবতা ও স্বদেশ ভাবনায় রুখে দাঁড়াও জঙ্গীবাদ এই স্লোগানে প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে গান কবিতার মিছিল ছোটে শহীদ মিনার থেকে গুলশান অভিমুখে। পদযাত্রা শেষে গুলশান ও শোলাকিয়ায় নিহতদের স্মরণে পুলিশ প্লাজা কনকর্ড শপিংমলের সামনে প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয়। সহস্রাধিক সংস্কৃতিকর্মী হেঁটে পাড়ি দেন প্রায় সাত কিলোমিটার পথ। তাদের সঙ্গে হাতিয়ার ছিল গান আর কবিতা। যাতে উঠে আসছিল স্বদেশ প্রেমের কথা, মানবিক সমাজ গঠনের কথা। যা জাগ্রত করেছে সাধারণ মানুষকেও। এই জাগরণ হয়ে উঠবে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে বলেই মনে করা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধিতে সরকার উদ্যোগ নেবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

এই প্রতিবাদ ও গণজাগরণের র‌্যালীতে প্রত্যেক বক্তাই প্রায় অভিন্ন কন্ঠে বলেছেন,  ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানের বাংলাদেশকে কখনও জঙ্গী হত্যার চারণভূমিতে পরিণত হতে দেয়া যাবে না। শুরুতে মুক্তচিন্তার মানুষকে হত্যার মাধ্যমে এর বিস্তৃতি ঘটায়। এখন শিক্ষক, সাহিত্যিক, মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ কেউ এদের হাত থেকে আর নিরাপদ নয়। হাজার বছর ধরে আমরা অনেক আনন্দ বেদনাকে ভাগ করে নিয়েছি। আজও এই পরিস্থিতিতে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আজ আমাদের বাঙালী ঐতিহ্যর কাছে ফিরে যেতে হবে। বাঙালী ঐতিহ্য শান্তি ও সম্প্রীতির কথা বলে। এই ঐতিহ্য প্রমাণ করে সকল ধর্মবর্ণের মানুষের এই বাংলাদেশ। রাষ্ট্র জঙ্গীবাদ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমরা সংস্কৃতি চর্চার প্রসারের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলব এই অঙ্গিকার করে আরও বলেন,‘পাকিস্তানী নিপীড়নে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন পরবর্তীতে ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা গান কবিতা নিয়ে পাশে ছিলাম। আজও আমরা তাই নিয়েই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই।” বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের স্থান নেই। ত্রিশ লক্ষ শহীদের বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের ঠাঁই নাই। এ সময় তিনি সম্প্রতি জঙ্গী হামলায় যারা জীবন দিয়েছেন তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে মানবিক সমাজ গঠনের সময় এসেছে এখন।

কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, রাজনৈতিক ঐক্য ছাড়া শুধুমাত্র কি সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমেই দেশ বর্তমান এই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে পারবে? এক্ষেত্রে বলা যায় ইতমধ্যে বিএনপি জামায়াত ছাড়া প্রায় সব দলের মধ্যেই ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন। জাতীয় ঐক্য বিষয়ে আমরা যদি বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তা হলে দেখতে পাই, বাহান্নার ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন পরিশেষে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনটাতেই জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন হয়নি। সে সময়েও বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে জনমানুষের ঐক্যের প্রতি জোর দিয়েছিলেন। কেননা, রাজনৈতিক ঐক্যের প্রশ্ন আসলেই দরকষাকষির প্রশ্ন আসে, কিন্তু জনমানুষের ঐক্যে কোন দরকষাকষি নেই, মানুষ দেশ ও জাতির প্রয়োজনেই ঐক্যবদ্ধ হয়। আর প্রতিবারই রাজনৈতিক দলের অপেক্ষা না করে সর্বাগ্রে এগিয়ে দেশের মুক্তবুদ্ধি ও সাংস্কৃতিক জগতের মানুষ। যেমনি এগিয়ে এসেছে এবারও।

পরিশেষে, একটি কথা বলতে চাই আর তা হলো, সারা বিশ্বেই অশুভশক্তি সাংস্কৃতিক সংহতিকে ভয় পায়। আর ভয় পায় বলেই, বিশ্বের সব দেশেই তারা প্রথম আঘাত হানে সাংস্কৃতিক নিদর্শনের ওপর। তাদের সব ক্ষোভ ও রাগ পতিত হয় পাথরের তৈরি মনুমেন্টের ওপর, তাই তারা দেশে দেশে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জাগরণের সব স্মৃতিচিহ্ন গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের ক্ষোভ প্রসমিত করতে চায়, কিন্তু কখনো পারে না। আবার ভেঙে দেয়া সেইসব স্মৃতিচিহ্ন ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তুপের মধ্যে ওঠে দাঁড়ায়। তাই যে কোন দেশ বা রাষ্ট্রের যে কোনে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে সত্যিকারের সাংস্কৃতিক জাগরণই  হয়ে ওঠে মোক্ষম হাতিয়ার।   

(মোট পড়েছেন 54 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন