নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও সাদা চামড়াওয়ালাদের গোঁস্যা

- মাহবুবুল আলম

আগামীকাল ৫ জানুয়ারি ২০১৪ বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু প্রধান বিরোধীদল বিএনপি-জামায়াত তথা নাম সর্বস্য ১৮দল নির্বাচন বর্জন করায় বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের যে উত্তাপ ছড়ায় তাদের বর্জনের মুখে তা অনেকটাই নিরুত্তাপ। নির্বাচন নিয়ে কি খেলা হয়েছে, নির্বাচনের বিএনপি কার কারণে এলোনা সে বিষয়টা দেশবাসীর কাছে অনেকটাই পরিস্কার। তাই এ নিয়ে কথা বাড়ানো বাহুল্যই মাত্র। তবে আমার আজকের লিখার বিষয় নির্বাচন না হলেও এ বিষয়টির সাথে নির্বাচনের বিষয়ক প্রাসঙ্গিক বিষয় নির্বাচন পর্যবেক্ষন নিয়ে। কেননা, দুই হাজার এক সালের নির্বাচনের আগে বিদেশি কুটনীতিকরা যেভাবে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেই নির্বাচনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ম্যানুপুলেটের মাধ্যমে তাদের স্বার্থ সিদ্ধি করার সুযোগ পেয়েছিল ১০ জতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে সব কিছুতেই নাক গলাতে আসা সাদাচামড়াওয়ালারা তেমন সুবিধা করতে না পারায় অনেকটাই গোঁস্য করে আগামীকাল অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে তাদের নিজ নিজ দেশের পক্ষে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার প্রেক্ষিতে এই লেখার অবতারণা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রথমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জানানো হয় দশম জাতীয় নির্বাচনে তারা কোন পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। তারপর কমনওয়েলথ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইইউর সঙ্গে সুর মিলিয়ে জানিয়ে দেয় তারাও বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে কোন পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। সর্বশেষ রাশিয়ার পক্ষ থেকেও জানানো হয়, তারাও নির্বাচনে কোন পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আসলেই কী আমাদের দেশের প্রতিটি নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি খুবই জারুরী? এ বিষয়টা আমাকে ভাবায়না শুধু একটা স্বাধীন সার্বভৌমদেশের সন্মানের ক্ষেত্রে বেমানান এটা আমাদের জন্য মর্যাদাহানীকরও বটে। তাই এ বিষয়ে একটা কিছু লিখতে মনের ভেতর তারণা অনুভব করছিলাম।
বাংলাদেশে জাতীয় কিংবা বড়দাগের স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষনের বিষয়টি এখন অনেকটাই যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। তাই দেশে নির্বচান এলেই কি দেশি কি বিদেশি নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল, গ্রুপ বা বাংলাদেশের বিদেশি প্রায় বন্ধুদেরই নির্বাচন পর্যবেক্ষনের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। ভাবখানা এমন নির্বাচন যতই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সাথেই অনুষ্ঠিত হোক তাদের সার্টিফিকেট ছাড়া যেন সেই নির্বাচনের বৈধতাই নেই। কিন্তু উন্নত বিশ্বের যে সব বন্ধু দেশ! আমাদের দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য বিপুল-বিশাল কর্মযজ্ঞ চালান, তাদের দেশের নির্বাচনে কিন্তু কোনো পর্যবেক্ষক কেন কেউ নির্বাচন নিয়ে নাক গলাক তা তারা পছন্দ করেন না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় চলছে। এমন কি হাল আমলের টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যরাতের টকশো’তে (কারো কারো মতে প্যাঁচালে) ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক না আসার নিদ্ধান্ত নিয়ে চলছে নানা হৈচৈ। কিন্তু ধনী দেশগুলোর জাতীয় নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকের প্রয়োজন না হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই শুধু বিদেশী পর্যবেক্ষকদের প্রাধান্য দেয়া হয়। আমাদের মতো দেশগুলোতেই জাতীয় নির্বাচনেই বিদেশ থেকে পর্যবেক্ষক আসে। এর সাথে অত্যান্ত লাভজনক হিসেবে দেশের ভেতরও অনেক এনজিও গজিয়ে ওঠেছে শতাধিক। নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল বা ওয়ার্কিং গ্রুপ বিভিন্ন দেশের সাদাচামড়াওয়ালাদের কাছ থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নামে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা এনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নামে ভাগভাটোয়ারা করে খায়। এমন অনেক পর্যবেক্ষণ সংস্থা বা দলের কথা বলা যাবে। কিন্তু এখানে আমি কারো বা কোন প্রতিষ্ঠানের নাম বলে বিরাগভাজন হতে চাই না।
বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই বিদেশ থেকে পর্যবেক্ষক আসে। বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক আসে সাদাচামড়ার উন্নত দেশগুলো থেকে। অধিকাংশ সময় নিজেদের টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে এসে এসব পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। পর্যবেক্ষণ শেষে নির্বাচন বিষয়ে মতামত প্রদানের পরে আবার নিজ নিজ দেশে চলে যান। তবে ধনী দেশগুলোর জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে বিদেশী পর্যবেক্ষকের মতামত প্রাধান্য পায় না। তারা নিজেদের দেশে পর্যবেক্ষক রাখতেও খুব একটা আগ্রহী নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, রাশিয়া, মালয়েশিয়ার মতো উন্নত রাষ্ট্রগুলো জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করে বিদেশী পর্যবেক্ষক আনে না। এসব দেশ তাদের জাতীয় নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের মতামতকে খুব একটা প্রাধান্যও দেয় না। তবে অধিকাংশ সময়ই ধনী ও উন্নত রাষ্ট্রের পর্যবেক্ষকরা উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য কোটি কোটি পাউন্ড বা ডলার খরচ করতে কৃপণতা করে না। এখানে তাদের উদ্দেশ্য কি? এক কথায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি দাদাগিরি ফলানো।
আমাদের দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ইতিহাস খুব দীর্ঘ দিনের নয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশে সর্বপ্রথম ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। সে সময় শুধু দেশী পর্যবেক্ষক সংস্থা পর্যবেক্ষণে অংশ নেয়। এরপর ১৯৯০ সালের উপজেলা নির্বাচনে সীমিতসংখ্যক বিদেশী পর্যবেক্ষক আসে। তবে ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে প্রচুর বিদেশী পর্যবেক্ষক অংশ নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষক অংশ নেন। অবশ্য এসব নির্বাচনে দেশী পর্যবেক্ষক সংস্থাও অংশ নেয়। ১৯৯১ সালের পর থেকে দেশে বিভিন্ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা গজিয়ে ওঠতে থাকে। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত ১২০টি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
১৯৮৬ আনপ্রেডিকটেবল স্বৈরাচারী এরশাদের অধিনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য হবেনা এ আশঙ্কায় নির্বাচন বয়কটের ঘোষণার মুখে সেই সময় থেকেই আমাদের দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষনের সংস্কৃতি শুরু হয়। সে হিসেবে ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশে দেশে প্রথম নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শুরু যা ‘খাল কেটে কমির আনা’র মতো আমরাই এনেছিলাম। এরপর স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর ৯১ সালের প্রধান বিচাপতি সাহাবউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে প্রচুর বিদেশী পর্যবেক্ষক আসতে শুরু করে।
এ প্রসংগে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ সংবাদ মাধ্যমের সাথে আলোচনায় বলেন,‘ ১৯৯১ সাল থেকে বিদেশী পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে। তবে তার আগেও এদেশে অনেক নির্বাচন হয়েছে। সেসব নির্বাচনে পর্যবেক্ষক ছিল না। বন্ধু রাষ্ট্রগুলো নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠালে ভাল। তবে তারা পর্যবেক্ষক না পাঠালেও মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশী পর্যবেক্ষকরা থাকবে বলেও তিনি জানান।
দেশী ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ১০ হাজার পর্যবেক্ষক ভোটকেন্দ্রে থাকবেন; তবে দেশে অনেক স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থা আছে, তারা পর্যবেক্ষণ করবে।
জানা গেছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের প্রধান পর্যবেক্ষক মোর্চা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)। ইডব্লিউজি থেকে নির্বাচনে ১০ হাজার পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থাটির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যম মারফত জানা গেছে। যেসব সংসদীয় এলাকায় দীর্ঘ মেয়াদী পর্যবেক্ষণের কার্যক্রম করছে তা অব্যাহত রাখবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সার্বিক পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট সকলের সামনে তুলে ধরবে।
তবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশী সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষক না আসায় উদ্বিগ্ন নয় নির্বাচন কমিশন। এ কথা বেশ আস্থার সাথে বলেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন,“বিদেশী পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা না করা পর্যবেক্ষক সংস্থার নিজস্ব ব্যাপার। প্রত্যেক সংস্থার নিজস্ব নীতিমালা আছে। সেসব বিবেচনা করে তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
তাই এ বিষয়ে লেখার পরিধি বাড়িয়ে পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাইনা। শেষ করবো বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্টজন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি লেখার অংশবিশেষের উল্লেখ করে। জনাব জাফর ইকবাল গতকাল ৩ জানুয়ারি ২০১৪ দৈনিক জনকন্ঠে তাঁর সাদাসিধে কথা, বিষণ্ণ বাংলাদেশ’ শিরোনামের কলামে আমাদের দেশ নিয়ে বিদেশিদের মাথাব্যথা এবং সাদা চামড়াওয়ালাদের কর্মকান্ড নিয়ে কিছু কথা বলেছেন, আমার এ লেখার সাথে তাঁর লেখার যে অংশটুকু প্রাসঙ্গিক তা এখানে উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি তার লেখায় বলেছেন,“… আমাদের নির্বাচন নিয়ে সারা পৃথিবীর সব দেশের খুব আগ্রহ সবাই একজন একবার একবার করে এসে গেছে। বড় বড় কথা আর ভাল ভাল উপদেশ দিয়ে গেছেন। তবে সাদা চামড়া দেখলেই আপ্লুত হওয়ার দিন মনে হয় শেষ হয়ে গেছে। বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে যাওয়ার সৌজন্যটুকু পর্যন্ত যখন দেখানো হয় না তখন সেই সাদা চামড়া থেকে সাবধান থাকা ভাল সারা পৃথিবীতে তাদের জন্য এক রকম নিয়ম, বাংলাদেশে তাদের নিয়ম অন্যরকম সেই কারণটা কী তাদের মুখ থেকে খুব শুনতে ইচ্ছে করে!… আমি পত্রিকার সম্পাদক নই, যদি পত্রিকার সম্পাদক হতাম তাহলে আমার পত্রিকায় বড় বড় করে এটা ছাপাতাম, সবাইকে বলতাম এই দেশের সমস্যা সমাধান করার জন্যে বাইরের দেশের সাদা চামড়াদের দরকার নেই। আমাদের দেশের মানুষেরাই আমাদের দেশে এর সমাধান করতে পারে ”
সবশেষে এই বলেই শেষ করবো, যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসে তারাও যে একেবারে নিরপেক্ষ তা কিন্তু নয়। তারাও কোনো না কোনো দলের পার্পাস সার্ভ করতে আসে। যারা বেশি বেশি তাদের কথা শোনে তাদের স্বার্থে কাজ করে তাদের পক্ষেই পর্যবেক্ষণের ব্যারো মিটার ওঠে। আর দেশি পর্যবেক্ষকদের কথা কি বলবো; তারাও কেউ না কেউ আওয়ামী লীগ, বিএনপি না হয় জামায়াত ঘরানার। আর পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো যে লাভের পেছনে ঘোরে তা বোঝা যায় পর্যবেক্ষণ সংস্থার সংখ্যার ওপর। এই কাজটি না লাভজনক না হলে দেশে কেন ১২০টির মতো পর্যবেক্ষক সংস্থা গড়ে ওঠেছে তা এমনিতেই আন্দাজ করা যায়।

(মোট পড়েছেন 73 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন